বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ফলাফল—বরাবরই বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনের জন্য স্পর্শকাতর ইস্যূ। জনগণের ম্যান্ডেটের প্রথম প্রতিফলন—এখানেই দেখা যায়। শিক্ষিত-সচেতন মানুষের প্রথম আখড়া এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। যত বড় দলই হোক, এটাকে উপেক্ষা করার জো নেই। এজন্য দলীয় সরকার ক্ষমতায় থাকাকলীন সময়ে—বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচন দেয় না। ভয় পায়! হেরে যাওয়ার ভয়! যদিও হারজিত স্বাভাবিক! তবুও কেনো যেন ক্ষমতাসীনরা ভয় পায়। ক্ষমতা আপনাকে মহৎ করে, আবার ক্ষমতা আপানাকে ঘৃনার সর্বোচ্চ স্তরে নিয়ে—ছেড়ে দিতে পারে। ইতিহাসের পাতায় তাকালে দেখতে পাবেন—বহু সরকার প্রধান ক্ষমতার মোহে আচ্ছন্ন হয়ে—জনগণের ম্যান্ডেট অস্বীকার করার কারণে—শেষে করুন পরিণতি ভোগ করেছে—করতেছে—করবে। ইতিহাসের একটি নির্মোহ সত্য হচ্ছে—তা ঘুরে ফিরে আসে। কিন্তু, কেউই ইতিহাসের শিক্ষাকে গ্রহণ করে না। অনেক ক্ষেত্রে অবজ্ঞা করে। আজকে ডাকসুতে ছাত্র-শিবির জিতেছে বলে—যারা চেতনার ধ্বজাধারী হয়ে—হাহাকার করতেছেন—তাদেরকে একটা কথা মনে করিয়ে দিচ্ছি—ইতিহাসে কোনো সুনিদিষ্ট চেতনা বা মূলবস্তু বলে কিছুই নেই—সবই আপেক্ষিক—আজ যেটা গ্রহণযোগ্য কালের পরিক্রমায় কালকে সেটা অগ্রহণযোগ্য—বিপরীতটাও সত্য। আজ যেটা বাস্তবতা—আগামীকাল সেটা মানুষের নিকট সবচেয়ে ঘৃনার বিষয়—যদি সেটা সময় ও মানুষের চাহিদার পরিপন্থী হয়। দলীয় রাজনীতি—আর ভোটের রাজনীতি পুরোটাই আলাদা জিনিস—আপনার দলীয় রাজনীতিতে শক্ত অবস্থান থাকলেও—সুষ্ঠু ভোটের রাজনীতিতে আপনি নাকাচুবানি খাবেন না—তার কোনো গ্যারান্টি নেই। ভোটের রাজনীতিতে ভালো করতে হলে—আপনাকে জনগণের ম্যান্ডেট বুঝতে হবে—জনগণ কি চায়—সময়ের প্রেক্ষাপটে তাদের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামাজিক-ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক চাহিদাগুলো কি কি—এগুলোকে তারা কিভাবে মূল্যায়ন করে—ইত্যাদি। কমিউনিটি বেসিকসে আপনিও ভোট পাবেন—তবে সেটা বৃহত্তর জনগণকে আপনার পক্ষে টানবে না—নেতা-কর্মী-সমর্থক গোষ্ঠীর ভোটগুলো পাবেন।
আজকে ছাত্র শিবির জিতেছে—কালকে এই ছাত্র শিবিরকেই ছাত্রছাত্রীরাই প্রত্যাখ্যান করবে—যদি তারা ছাত্রছাত্রীদের ম্যান্ডেট অস্বীকার করে—এটাই ইতিহাসের নির্মোহ সত্য—অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। আপনি ছাত্র শিবিরের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রোপাগান্ডা ছড়ালে—আদতে আপনারই ক্ষতি হবে। কারণ, আপনার মূল্যায়নের যায়গাটা আপনি নিজ হাতে নষ্ট করে ফেলছেন। জনগণকে বোকা ভাবলে ভুল করবেন। এদেশের মানুষ দেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে—স্বেচ্ছায় জীবন উৎসর্গ করেছে বারবার। সুতরাং, জনগণকে বোকা ভাবা—আর নিজে বোকার স্বর্গে বাস করা সমান। সব কথার এককথা—আগের মত ভাবার সময় এখন আর নেই। এখন আপনাকে সময়ের নিরিখে ভাবতে হবে—কথা বলতে হবে—কাজ করতে হবে—জনগণের সাথে মিশে কাজ করতে হবে। রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন মেনে নিয়েই রাজনীতি করতে হবে।
ডাকসুর নির্বাচনে সবচেয়ে মজার ঘটনা হচ্ছে—জগন্নাথ হল আর মেঘমল্লার বসু। এরা এখন মূল স্রোত থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিয়ে—বিলীন হওয়ার পথ পরিক্রমায় অগ্রসর হয়েছে। অনেকটা স্বেচ্ছায় তারা এথনিক ক্লিনজিংয়ের পথ বরণ করে নিয়েছে। মেঘমল্লার অন্যান্য হলগুলোতে মোটামুটি পরিমান ভোট পেলেও, জগন্নাথ হলে—সে তার পদে এককভাবে বলা যায় পুরোটাই পেয়েছে। আর জগন্নাথ হলের ছাত্রদের আচার-আচারণ মিডিয়াতে যেভাবে ধরা পড়েছে—তাতে করে বাংলাদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে তারা তাদের গ্রহণযোগ্যতা বৃহত্তর পরিসরেই হারিয়ে যেতে দেখবে। এই সম্প্রদায়ের লোকজন কেনো জানি বাংলাদেশকে ওন করতে শিখে নাই। সম্ভবত, তারা নতুন দেশ প্রাপ্তিকে ১৯৪৭ সালের সময় থেকেই গ্রহণ করতে পারে নাই—বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে এ কথাটা তিনিও বলেছেন। ইদানিং একটা বিষয় খেয়াল করেছেন কিনা জানি না—পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের বাংলা ভাষায় কথা বলার কারণে বাংলার মাটিতেই ধরে আঘাত করা হচ্ছে। বিশ্বাস না হলে সার্চ দিয়ে দেখে নিয়েন। এটার ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ অন্য কোনোদিন করবো। বাঙালি-বাংলাদেশি হিন্দুরা ভারতকে যতটা ধারণ করে—বাংলাদেশকে ঠিক ততটাও ওন করে না। অনেককে এমন প্রত্যাশা নিয়ে দিনযাপন করতে দেখেছি—তারা মনে করে বাংলাদেশ আবারো ভারতের অংশ হবে কোনো একদিন। যদিও তারা বাংলাদেশের ইতিহাস জানে না। জানলে তারা—এ প্রত্যাশা বাদ দিয়ে—বাংলাদেশের সুনাগরিক হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলার চেষ্টা করতো। যেকোনো অবস্থানে আপনাকে টিকে থাকতে হলে, নতুন সময়কে সাদরে গ্রহণ করতে হবে। আগের সময় নিয়ে পড়ে থাকলে আগাতে পারবেন না—কেউই আপনাকে গ্রহণ করবে না। মূল স্রোতের পরিবর্তনের ধারাটা সবার আগে বুঝতে হবে। বুঝে সেই স্রোত ধরে আগাতে হবে। বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে—আপনার সকল গ্রহণযোগ্যতা হারিয়ে ফেলবেন। মানেন আর না মানেন—এটাই সত্য; এটাই বাস্তব!