আমার একটি চিরায়ত অভ্যাস হচ্ছে—বই কেনা। টাকা থাকলে বই কিনি—না থাকলে ধার করে কিনি। পরে টাকা হাতে আসলে—পরিশোধ করি। কথা সেটা নয়—কথা হচ্ছে—কতিপয় জ্ঞানপাপী লোকজন—এটাকে ফাও খরচ মনে করে। নিরুৎসাহিত করে। বড়ই দুঃখজনক ব্যাপার! সৈয়দ মুজতবা আলীর “বই কেনা” ও প্রমথ চৌধুরীর “বই পড়া” প্রবন্ধ পড়ে—এত বেশি বই কেনার প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠি—গো-গ্রাসে বই কেনা শুরু করি। খাওয়ার টাকা বাঁচিয়ে বই কিনি—পোশাক কেনার টাকা বাঁচিয়ে বই কিনি। শুরুর দিকে যখন বই কিনতাম—তখন পড়া অত হতো না। একটা সময় চোখের সামনে অজস্র বই—খুলে দেখতে দেখতে—কখন সব পড়ে ফেলতাম তার ঠিক থাকতো না।
এখনো বই কেনা—বই পড়ার অভ্যাসটা জারি রয়েছে। মৃত্যু অবধি এভাবে বই পড়ে কাটিয়ে দিতে চাই। সত্যিকারার্থে, বই পড়ার স্বাদ—একবার যে আস্বাদন করতে পেরেছে—সে বাঘের নর-মাংসের স্বাদ পাওয়ার মতই—উন্মাদ হয়ে বই পড়ে। টাকা তার কাছে কোনো বিষয় না—ধার করেও সে বই কিনে পড়ে। আমার এটাই হয়েছে। এমনও হয়েছে—দূরের লাইব্রেরিতে ৫০ টাকা নিয়ে—বাই-সাইকেল চালিয়ে বই কিনতে চলে গেছি। আমার পড়ার মত বই—হাতের নাগালে না থাকলে—এটাই করতাম। একবার ৫-৫ কিলোমিটার পথ হেটে বই কিনে নিয়ে এসেছিলাম। বাস্তবতা বড়ই কঠিন। গাড়ি ভাড়ার টাকার অভাবে এটা করতে হয়েছিল। বই পড়া—নেশা-পেশা—দুটোই। এ জাতীয় নেশা-পেশাকে মানুষ পাগলামী মনে করে। আমাকে প্রায়ই পাগল বলে সম্বোধীত হতে হয়।
বই কেনার এই অভ্যাসটা পিতামহকে দেখে জাগ্রত হয়। ব্রিটিশ-পাকিস্তান আমলের শিক্ষিত লোক ছিলেন। তার অনেক বই ছিলো। তার সময়ে অত্র এলাকায় তিনিই একমাত্র শিক্ষিত লোক ছিলেন। পরে আরো অনেকে পড়ালেখা শিখেছিল—দাদার কাছে। দাদা গল্প করেছিলেন—তিনি পড়ালেখা করার জন্য—অনেক কিছু হারিয়েছিলেন। আমারও একই অবস্থা—একপ্রকার সংগ্রাম করে পড়ালেখা শিখতে হয়েছে। কতশত বাজে মন্তব্য—আর কথার গ্লানি বহন করতে হয়েছে—তার ইয়ত্তা নেই।
আমার নেশা বলতে—এই বই কেনা—বই পড়া। আর কোনো নেশা আমার নেই। এজন্য আমি সব সময় চেষ্টা করি—পড়ালেখার মধ্যে থাকা যায়—এমন কোনো পেশা অবলম্বন করতে। মহান সৃষ্টিকর্তা—আমাকে যেন ঠিক সেভাবে—সম্মানজনক পথ বাতলে দেন। আমি সব সময় দোয়া করি—এমন কোনো যায়গায় যেন আমাকে তিনি প্রেরণ না করেন—যেখানে আমার পড়ার পরিবেশ ও আত্মসম্মানবোধ হারাতে হয়। আমি এই একটা চাওয়া নিয়ে সবসময় মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে মানসিকভাবে প্রার্থনারত থাকি।
সবার সাথে মিশে থাকার একটা আঁকুতি কাজ করে—এটার মধ্যে সামাজিকীকরণের একটা বিরাট বোধ রয়েছে—যেটা সবার মধ্যে জাগ্রত হয় না। সামাজিকীকরণ নিয়ে অনেক কিছু পর্যবেক্ষণ করি—তবে বর্তমানে হতাশ হওয়া ছাড়া বিকল্প কিছুই পাই না। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে নিকৃষ্ট একটা প্রবহমাণ ধারা আমাদের জাতিগত ধারার মধ্যে অবাঞ্চিতভাবে ঢুকে গেছে—যেটা আমাদের যুগ থেকে যুগান্তরে বহন করে চলতে হচ্ছে। শিক্ষা আর শিক্ষকের মান উন্নয়ন অতীব জরুরি—তা না হলে এ প্রবহমান ধারা—জাতিগতভাবে আমাদেরকে নিঃশেষ করে দিবে। এখনকার বাবা-মায়েরা সন্তানদের শুধুই আদর করেন। শাসনের ভারমুক্ত অভিভাকত্ব—শাসন ক্ষমতামুক্ত শিক্ষক সমাজ—অবসরে অবাঞ্চিত—সময়ে সময়ে তারা এ সব মানব সন্তান কতৃক লাঞ্চিত হন। ব্যাপারগুলো কোনো অলৌকিক কিছুই না—নিছকই জাতিগত কর্ম ফল।
আর একটা দিক আমার মধ্যে আমি পেয়েছি—সেটা হচ্ছে—নতুন কিছু শেখার প্রতি প্রবল আগ্রহ। নতুন কিছু দেখলে—তা রপ্ত করার জন্য উঠে-পড়ে লেগে যাই আমি—ব্যাপারটা আসলে কিভাবে কি করে—সেটার শেষ না দেখা পর্যন্ত আমি শান্ত হই না। আমার মধ্যে শেখার এ প্রবল আগ্রহ জারি রয়েছে। বর্তমান প্রযুক্তির নানান দিক নিয়ে—আমি অনেক কৌতুহলী। সেটা নিয়ে অনেক ঘাটাঘাটি করা পড়ে—সারাদিন। ওয়েবসাইট, ওয়েব-ট্রাকিং, সাইবার সিকিওরিটি এবং ভিডিও নিয়ে আমার বিস্তর—জানাশোনার যায়গা রয়েছে। প্রতিনিয়তই আমি আরো বেশি নিজেকে সমৃদ্ধ করার চেষ্টা করি—এখানে। আসলে সামনের দিনগুলো—মানবজাতির জন্য অনেক কঠিন সময় অপেক্ষা করছে। আপনি না খেয়ে মরবেন না। তবে, আত্মসম্মান বোধ নিয়ে বেঁচে থাকাটা কঠিন হবে। কারণ, প্রচলিত সাইবার নিরাপত্তার ধারণা—একটি মিথ ছাড়া কিছুই না। সবই ওপেন সিক্রেট। আপনি শুধু—সময়ের বলি হননি। হতেই বা কতক্ষণ। প্রাইভেসি বলতে আপনার কিছুই নেই। সবই বোগাস ধারণা। আপনাকে এই বুলি আওড়ায়ে বোকা বানানোর মহাসড়ক প্রস্তুত করে রাখা হচ্ছে। যেকোনো মুহুর্তে আপনি সময়ের বলি হবেন। যতদূর সম্ভব—মিনিমালিস্টিক জীবনযাত্রা নির্বাহ করতে পারবেন—ততই আপনার জন্য মঙ্গলজনক হবে। চাকচিক্যতায় নিজেকে ভাসিয়ে দিলে—আপনি বানভাসি মানুষের মত—উদ্বাস্তু ঘরানার মানুষে পরিণত হবেন—নিমিষেই। যে জীবন—আসলে কোনো স্বাধীন সত্তার জীবন হতে পারে না।
এ যায়গাটাতে কাজ করার বিশাল একটা ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। ভুক্তভোগী মানুষকে সাহায্য করার—একটা যায়গা এখানে রয়েছে। কারণ, নয়া প্রযুক্তি—নয়া সমাধান—নয়া সংকট। নতুন প্রযুক্তি নতুন সুবিধার সাথে—নতুন কিছু সমস্যা—নতুন কিছু ফাঁদ নিয়ে হাজির হয়—যেগুলো নতুন নতুন ব্যবহারকারীরা অবচেতন মনে অবলীলায় আগ বাড়িয়ে—ফাঁদে ধরা দেয়। এটা হওয়ারই কথা—উন্মুক্ত বিশ্ব-ব্যবস্থায়—অশিক্ষায়-কুশিক্ষায় শিক্ষিত লোকজন—ফাঁদে পড়ে—খুব সহজে। আর তাদেরকে ফাঁদ মুক্ত করার জন্য—একটা বিশাল বাজার তৈরি হয়েছে। যেটাকে আমরা বলি—অনলাইন মার্কেটপ্লেস। এখানে মানুষ তার হাজারো সমস্যার সমাধান পেতে—স্মার্ট-দক্ষ মানুষদের খুঁজে—তাদের সমস্যার সমাধান করে নেয়।
শুরু করেছিলাম—বই কেনা দিয়ে। আর শেষে এসে—সাইবার বিষয়ক কার্যক্রম দিয়ে শেষ করলাম। আসলে প্রত্যেকটা বিষয়ই এখানে ওতপ্রোতোভাবে একে-অন্যের সাথে জড়িত। আপনাকে আগে পড়তে-শিখতে হবে যথাযথভাবে—তারপর আপনি দুনিয়াদারির প্রয়োজনীয় খবরাখবর জানতে শিখবেন—জানতে পারবেন। এটাই নিয়ম। আসুন সময়কে অবজ্ঞা না করে—আমরা সময়কে প্রশ্রয় না দিয়ে—সময়কে যথাযথভাবে ব্যবহার করে—সুন্দর জীবনযাত্রা নির্বাহ করা শিখি।——ধন্যবাদ।