মানব জাতির ইতিহাসে গরুই একমাত্র প্রাণী, যা ধর্ম-বর্ণ, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সব মানুষের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। পবিত্র কোরানের সবচেয়ে বড় এবং প্রথম সারির সুরা হচ্ছে, 'বাকারা'। যার অর্থ গরু। আবার হিন্দু ধর্মাবলম্বীগণের নিকট গরু দেবতাতুল্য এবং পূজনীয়। অন্যান্য ধর্মের ক্ষেত্রেও কোন না কোনভাবে এটা জড়িত রয়েছে। তাছাড়া, গরু এমন একটি প্রাণী যার দেহের প্রতিটি অংশ মানুষের জন্য প্রয়োজনীয়। বাদ যায় না কিছুই। গরুর দুধকে বলা হয় সুষম খাবার। যাতে সকল ধরনের পুষ্টি বিদ্যমান।
আমিও খুব ছোটবেলা থেকে পারিবারিকভাবে গরু লালন-পালনের সাথে জড়িত। গরুর হাট ও গরুর খাদ্য ব্যবস্থাপনার সাথে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক থাকার কারণে, কিভাবে এটাকে আরো সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য করা যায়, নিজের প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখার পাশাপাশি সেটা নিয়ে নিরন্তর পড়ালেখা করছি ও ভাবছি। এমনকি, এখনো সরাসরি জড়িত রয়েছি।
সব কিছু দেখে, পড়ে, শুনে, বুঝে দেখেছি, গরু লালন-পালনের ক্ষেত্রে ঘাসের বিকল্প কিছুই হতে পারে না। ঘাসের বিকল্প, একমাত্র ঘাসই।
ব্যবহারিক দিক বিবেচনা করেও দেখেছি, ধানের বিচালি বা খড় গরুর কোন খাদ্যই না। এটাতে কোন পুষ্টি বিদ্যমান থাকে না। যারা বিচালি খাওয়ায়ে গরু লালন-পালনের দিকে ঝুঁকেছেন, তারা বেশিরভাগই গরুকে গৃহপালিত প্রাণী হিসেবে দেখেন। এটি যে একটি লাভজনক ব্যবসা সেটা তারা বোঝেন বলে মনে হয়নি। তারা গরু পুষতে হয়, তাই পোষেন বলে মনে হয়েছে।
তাছাড়া, বিচালি বা খড় খাওয়ায়ে গরু লালন-পালনের ভাবনাটা আগে সেভাবে নিগড়বদ্ধ চিন্তা-ভাবনায় ছিল না। এটা বড়জোর ৫০ বা ৬০ বছরের ভাবনা। এর আগে মানুষ প্রাকৃতিকভাবে ঘাস সমৃদ্ধ চারণ ভূমিতে ছেড়ে দিয়ে গরু পুষতো। শুধু বর্ষা মৌসুমে ২/৩ মাস নিতান্ত উপায় না পেয়ে গাদা করে রাখা বিচালি বা খড় খেতে দিত।
বুঝলাম না, সাধারণ ঘরোয়া গরু লালন-পালনকারীগণ পুষ্টিহীন খড়ের মধ্যে কি পেয়েছেন। ঘাসের বিকল্প কখনোই খড় হতে পারে না, পারে না, পারে না। এটা ভাবলে, সেটা ভুল ভাবনা। এমনকি মূর্খতা তো বঁটেই। আপনি শুধু পর্যাপ্ত ঘাস খেতে দিলেও, গরুর কাছ থেকে প্রত্যাশা মত ফল পাবেন। কিন্তু, ঘাস বাদে শুধু খড় বা দানাদার খাবার খাওয়ায়ে প্রত্যাশা মত ফল পাওয়ার চিন্তা করলে, তা হবে অলীক ভাবনা।
যেকোন ব্যবসার তিনটি ধরন রয়েছে। ক্ষুদ্র, মাঝারি এবং বৃহৎ। সব ব্যবসারই একটাই লক্ষ্য থাকে। তা হচ্ছে, বৈধ পন্থায় মুনাফা করা।
ক্ষুদ্র পর্যায়ের ব্যবসায়ীগণ মার্জিন টানতে না জানার কারণে দ্রুতই মূলধন হারিয়ে ফেলেন। একটু বুঝে ব্যবসায় নামলে মূলধনসহ লভ্যাংশ নিয়ে ব্যবসায় দীর্ঘদিন টিকে থাকা সম্ভব।
বিশেষ করে উৎপাদনশীল ব্যবসার ক্ষেত্রে আপনাকে অনেক বেশি সতর্ক হিসাবী ঝুঁকি নিতে জানতে হবে। তা না হলে, যেকোন মূহুর্তে মুনাফার পরিবর্তে মূলধন হারাবেন।
যাহোক, ঘাস নিজে উৎপাদন করে গরু লালন-পালনের চিন্তা-ভাবনা করতে হবে। যেকোন কাজের শুরু থেকে ভোক্তার হাতে পৌছে দেয়ার কাজটা নিজে করতে পারলে, লভ্যাংশ এমনিতেই দ্বিগুণ হয়ে যায়।
যেখানে এক তাড়ি ঘাস উৎপাদন করতে গড়ে ৪/৫ টাকা খরচ হয়। সেখানে সেটা কিনে খাওয়াতে গেলে ৩০/৩৫ টাকা লাগে। ভেবে দেখুন, লভ্যাংশ স্ব-ইচ্ছায় অন্যের হাতে তুলে দিচ্ছেন।
এ জন্য আমি বলি, "যার ঘাস নেই, তার গরু পোষার দরকার নেই।" পুষ্টিহীনতায় ভুগে গরু আপনার অভিশাপের কারণও তো হতে পারে।
যে যা বলুক না কেনো; সর্বোপরি, গরুর মূল খাবার হচ্ছে ঘাস।
আগামী পর্বে থাকছে, কোন ঘাসে কি কি উপাদান ও পুষ্টি বিদ্যমান।





