তথ্য-উপাত্ত, যোগাযোগ-প্রযুক্তি এবং পণ্যের সহজলভ্যতা মানুষের করণীয়-বর্জনীয়, প্রয়োজনীয়তাকে ভুলিয়ে দিচ্ছে। এখন তো মানুষ ভাবতেই ভুলে গেছে। সারাদিন স্মার্টফোনে মুখ গুজে শুয়ে-বসে দিন পার করে দেয়। এমনকি ভার্চুয়ালিটির প্রাচুর্য মানুষের মধ্যকার মানবিক মিথস্ক্রিয়া নিঃশেষ করে দিচ্ছে। ফলশ্রুতিতে মানুষ প্রথা, রীতি-নীতি, আইন-কানুন, সমাজ, রাষ্ট্র, দেশপ্রেম সব কিছু থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। যে কারণে মানব দেহ নতুন নতুন মানসিক ও শারীরিক সংকট-জটিলতা সহ নানাবিধ রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে। সময় এসেছে সচেতন হওয়ার। প্রযুক্তির ব্যবহার হোক প্রয়োজনে।
বর্বর কৌলিণ্য ও উপনিবেশিক গলদ এখনো আমাদের মধ্যে রয়ে গেছে। মধ্যযুগীয় বর্বর কৌলিণ্য প্রথা ও আধুনিক যুগের উপনিবেশিক সম্রাজ্যবাদী চিন্তা-ধারার নিগড় থেকে আমরা এখনো বের হতে পারিনি। সৃষ্টিকর্তা চিন্তা করার শক্তি দিয়েছেন। চিন্তা করার স্বাধীনতা দিয়েছেন। আমরা সেটাকে স্বহস্তে অন্যের হাতে জিম্মি করে মুনাফার ডালি তুলে দিচ্ছি। এখনো সেই রাজা-প্রজা, জমিদারীর খেলার নিগড় থেকে মুক্ত হতে পারিনি। পদ্ধতিগত পরিবর্তন এসেছে; কিন্তু যে লাউ, সেই কদুই রয়ে গেছে।
আমরা এখনো অন্যের কুচিন্তা দ্বারা প্রভাবিত হই; খুব সহজেই। সময় এসেছে মানুষকে তার কর্মকাণ্ড, আচার-ব্যবহার আর মস্তিষ্ক দিয়ে বিবেচনায় নেয়ার। নিজের পরিবেশ নিজেই ঠিক করে নেয়ার। পরিবেশ দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে, পরিবেশে নিজের কর্ম দ্বারা অবদান রাখার এখনই তো সময়।
কর্মকাণ্ড পরিচালিত হবে আবেগ দিয়ে নয়; বিবেক দিয়ে। বিবেক সৃষ্টিকর্তার অপার দান। হেলায় নষ্ট করলে জবাবদিহিতা করার কোন উপায় থাকবে না।
শুধু আবেগকে প্রাধান্য দিলে দুনিয়াদারীর দায়িত্ব-কর্তব্য পালন করবে কে? এটা জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এগুলোই জীবন। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সব মানুষকেই ইহলৌকিক ও পারলৌকিক বিষয়ে জ্ঞানার্জন করতেই হবে। এটা সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে অবশ্য পালনীয় কাজ। ইহলোকের সৎকর্মই, পরকালের মুক্তির পাথেয়। সুতরাং, ইহলোকের দায়িত্ব-কর্তব্য এড়িয়ে বা অবহেলা করলে কোন মুক্তি মিলবে না। এগুলোর যথার্থতা আপনার মুক্তির পথ করে দিবে।
ভালো মানুষ সাজলে মুক্তি মিলে না; ভালো মানুষ হওয়াটাই মুক্তির মোক্ষম সুযোগ করে দেয়। আর ভালো মানুষ হওয়ার একমাত্র উপায় হচ্ছে, দায়িত্ব-কর্তব্য যথাযথ পালন করা, করণীয়-বর্জনীয়, প্রয়োজনীয়তা সম্বন্ধে জ্ঞানার্জন করা। কারণ, মুনাফেকও দেখতে অবিকল ভালো মানুষের মতই। এজন্য নিজেকেই জানতে হবে, শিখতে হবে। নিজের দায়-দায়িত্বও নিজেকেই নিতে শিখতে হবে। আপনার জবাদিহিতা অন্য কেউই করে দেবে না।
সুতরাং, কে ভালো আর কে মন্দ এটা মুখে না আওড়ায়ে আপন কর্মে মনোযোগ দেয়াটাই সমীচীন। নিজের মহামূল্যবান সময়টাকে অন্যের আলোচনা-সমালোচনায় ব্যয় না করে নিজের আত্মিক ও সার্বিক উন্নয়নে ব্যয় করাটাই বুদ্ধিমানের পরিচায়ক। তাছাড়া, আপন কর্মের প্রতি মনোযোগ জবাদিহিতাকে সহজ করে।
নিজের শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করে কোন লাভ নেই। পিছন থেকে গালিই শোনা লাগে। মানব সমাজ শো-অফ করাকে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচায়ক মনে করে। শো-অফ মানবিক মিথস্ক্রিয়াকে ধ্বংস করে দেয়। ব্যক্তি সম্পর্কে ব্যক্তির মননে নেতিবাচক ধারণার জন্ম দেয়। সামাজিক বিচ্ছিন্নতার মত খারাপ বিষয় জেঁকে বসে।