জীবনের সবচেয়ে বড় এবং প্রথম অনুপ্রেরণা! আজকে মরনাপন্নাবস্থায় পতিত হয়েছেন! সব যায়গা থেকে প্রত্যাখ্যাত হলেও, তিনি দশ টাকা হাতে দিয়ে বলতেন, 'যা দোয়া করে দিলাম! জীবনে অনেক বড় হ!' নিজের বংশধরদের মধ্যে বিবাদপ্রিয়তা দেখে আমি এমন কিছু মানুষের সঙ্গ নেয়ার চেষ্টা করেছিলাম, যারা সবাই ধর্মমনা ছিলেন! কাজেই, এলাকায় মাহফিল হলে কোন কথা নেই, নানীর কাছ থেকে ১০/২০ টাকা (দূরত্বানুযায়ী) নেয়া লাগবেই! তবে, গুনাকরকাটি ও ফিংড়ি ওরশ শরীফের সময় ৩০ টাকা দেওয়াই লাগবে! ঐ সময় চাহিদাটা খুব বেশি ছিল না! বেশি দিলেও কেন জানি এখন মনে হয় বোকার মত নিতে চাইতাম না!
আমার স্পষ্ট মনে আছে, শৈশব-কৈশোরের একটা দীর্ঘ সময় নানীর কাছে কেটেছে! ভালোবাসা ছিল অফুরন্ত! নানীর প্রথম নাতী ও সবার মধ্যে বড় হওয়ার কারণে আরো বেশি আদরের ছিলাম। যখন অনেক ছোট ছিলাম, তখন মামারা বা খালাম্মারা কেউ আসলে জেদ করতাম, যাবোই যাবো! না নিয়ে উপায় নেই! খালাম্মারা আসলে চেলার বিল (এ বিলে ছড়িয়ে আছে আমার হাজারো গল্পকথা) পাড়ি দিয়ে নানীর বাড়ি যেতাম! তখন অনেক ছোট হওয়ায় নানী কোলের মধ্যে করে ঘুম-পাড়ানীর গান শুনিয়ে ঘুম পড়াতেন। যেটা মা-বাবর কাছ থেকেও পায়নি! কারণ, বোনটা আমার থেকে খুব বেশি ছোট না! ওকে আম্মা একটু বেশি সময় দিতেন। তাছাড়া, আম্মাকে গৃহের কাজ সামলে গ্রামীন অর্থনীতির গ্যাড়াকলে পড়ে বাড়ি চাতালে ধানের কাজ করতে হতো আব্বার সাথে সমান তালে; বরঞ্চ বেশিই করতেন; কিন্তু স্বীকৃতি মেলা ভার! সেজন্য বোনটাও যে খুব বেশি সময় পেয়েছে, তা কিন্তু না! তাছাড়া, সামাজিক ও পারিবারিক কলহপ্রবণ একটা পরিবেশে বড় হয়েছি! এজন্য ভালোবাসা খুঁজেছি সর্বদা! কেউ দেয়নি ঐ সময়! সবাই মুখ ফিরিয়ে নিত! একমাত্র নানীই ভরসা ছিল! তাই বারবার ফিরে গেছি, তার কাছে! আমার এখনো স্পষ্ট মনে আছে, শীর্ণকায় হওয়ায় সবাই কেন জানি দূর্ব্যবহার করতো, পাশে যেতে দিতো না, কথা বলতে গেলে বকাবকি করতো; পাত্তা দিতো না, খেলতে নিত না, বিরোধীতায় পঞ্চমূখ থাকতো! আব্বা-আম্মা বলতেন, কেউ মারলে বা কিছু বললে মুখ বুজে বাড়ি চলে আসবে! একটু একটু করে অভ্যস্তও হয়ে গেছিলাম। দুনিয়াটা তখন নানীময় ছিল আমার! এখন যতদূরে যাই একাকিত্বই নিত্য সঙ্গী! কারণ, পৃথিবীর প্রত্যেকটা সম্পর্ক ট্রাঞ্জেকশনাল হলেও নানীর ভালোবাসার মধ্যে খাদ খুজে পায়নি! এমনকি প্লবতার সুত্র প্রয়োগ করলেও না! এখন নানী মৃত্যুশয্যায়!
এরপর যখন একটু বড় হলাম, নিজে নিজে যেতে শুরু করলাম। একদিন তো মহাকাণ্ড ঘটিয়ে ফেললাম! বলা যায় ৫/৬ বছর বয়স হবে! বিল পাড়ি দিয়ে নানীর টানে একা চলে গেছি, কাউকে না বলেই! বাড়ি শোকের মাতম শুরু হয়ে গেছে! ঐ সময়টাতে নারী ও শিশু পাচারের বিশাল চক্র ছিল! বর্ডার কাছে হওয়ায় সবাই চিন্তিত! এদিকে আমি নির্ভাবনায় নানীর কোলের মধ্যে গভীর নিদ্রা যাপন করছিলাম! আমার চাচা আব্বার অনুজ জনাব আব্দুস সাত্তার শেখ যথারিতি হাজির! যেয়ে দেখে আমি নানীর কোলে ঘুমাচ্ছি! যাহোক, তখন তো আর মোবাইল বা ফোন এত সহজপ্রাপ্য ছিল না! চাচাজান তাড়াতাড়ি বাড়ি গিয়ে খবর দেয় যে আমি নানীর কোলে ঘুমাচ্ছি! মায়ের ক্রোন্দন থেমেছিল তখন! বাবা-চাচাদের দুশ্চিন্তাও চলে গেল! তারপর স্কুলে ভর্তি হলাম! স্কুল পালাতাম প্রচুর! শুধু একটা কারণে, নানী! স্কুল পালানোর কারণে কটু কথা কম শুনতে হলো না! নানান কথার তালে-বেতালে পড়ে মনে হতো মরে যাই! সবাই বলতো এ মানুষ হবে না! নানী বলতো, একমাত্র নানীই বলতো ও অনেক বড় হবে! তারপর তো ধর্মমনা মানুষদের প্রেষণে মাদ্রাসায় ভর্তি হলাম; আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি! যথারীতি রাজশাহী ইউনিভার্সিটি থেকে অনার্স ও মাস্টার ডিগ্রি পাশ করেছি! জানি না কতটুকু বড় হতে পেরেছি বা পারবো! তবে, তার অনুপ্রেরণা, দুয়া আর ভালোবাসার জোরে টিকেছিলাম বলে মনে হয়! অনেকে অনেক কথা বলে, কিন্তু জীবনের বাস্তবতা ভিন্ন! একটু পরোখ করে না দেখে মন্তব্য করতে নেই! আপনার কাছে যা তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের ইস্যূ, খুঁজে দেখেন ঐটা পাওয়ার জন্য কেউ না কেউ জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ সময়গুলোকে আপনার অপছন্দের বা তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের শিকার বিষয়গুলোর জন্য ব্যয় করছে।
একটু একটু করে বড় হতে থাকলাম! ক্লাস ফোরে উঠে সাইকেল চালানো শিখলাম। আমার ছোটচাচা মাজেদ শেখ তখন একটা সাইকেলের গ্যারেজে কাজ করতেন! তার সুবাদেই শিখলাম! চাচার সাথে এখনো বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে চলি! ভালো মনের মানুষ! দাদার একটা ভাঙড়ি এবং অনেক উচু সাইকেল ছিল। পরে দাদা সেটা আমার আব্বার কাছে বিক্রি করে দেয়। সেটা চালিয়ে মাত্র দু'কিলোমিটার দূরের নানী-বাড়ি যেতাম। সপ্তাহের সাতদিন বিকাল বেলাটা বরাদ্ধ ছিল নানীর জন্য! দুপুর ২টার সময় সাইকেল নিয়ে হাওয়া হয়ে যেতাম বাড়ি থেকে! সবাই বুঝতে পারতো নানী-বাড়ি চলে গেছি! গল্প, খাওয়া-দাওয়া ইত্যকার কাজ, ভালোই লাগতো! সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার সময় ছোট্ট বোনের জন্যও প্যাকেট ভরে নারিকেল, পেয়ারা, জ্যৈষ্ঠ মাসে আম, কাঁঠালসহ মৌসুমী ফল-ফলাদি দিতেন। আহ্, দিনগুলো মনে পড়লে স্মৃতিকাতর হয়ে যায়! সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হচ্ছে নানী মৃত্যুযন্ত্রণায় শায়িত আছেন, এটা দেখা! মুক্ত করো আল্লাহ্!
পৃথিবীতে সবকিছুর মধ্যে একমাত্র ভালোবাসার নিখাদ পাত্র নানী! সবাই বকাবকি করলেও, তাকে কখনো বকাবকি করতে দেখিনি! বরঞ্চ, দেখেছি ভালোবেসে কাছে টেনে নিতে! বুঝ দিতেন! আঘাত করতেন না! ভালোবাসা ভরা পাত্রটা (কখনো ফুরোতে দেখিনি) মনে হয় নিঃশেষ হতে চলেছে!
সবাই আমার চাক্ষুস প্রথম স্মৃতিবিজড়িত অগাধ ভালোবাসার পাত্রের জন্য দোয়া করবেন! আল্লাহ্ যেন তাকে মুক্ত করেন! আমিন!
(নানী মারা যাওয়ার আগে দুই/ আড়াই মাস পীড়িত ছিলেন! সে সময়ের লেখা এটা; সম্ভবত নভেম্বর মাসের ২৫ তারিখে লেখাটা শেষ করেছিলাম। নানী মারা গেছেন ৬ ডিসেম্বর সন্ধ্যা ৬:৩০ মিনিটের দিকে।)