সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

দেশ ও ধর্ম


দেশের ধর্মীয় অঙ্গনে সবচেয়ে সস্তা শব্দ হচ্ছে, 'নাস্তিক-মুরতাদ'। আলেম-ওলামাগণ যত্রতত্র শব্দগুলো ব্যবহারের কারণে পরিস্থিতি বিশৃঙ্খল হয়ে যাচ্ছে। ক্ষেত্রবিশেষ ব্যক্তিগত কারণে মানুষ একে-অন্যকে এসকল অভিধায় অবহিত করতেও ভাবছে না।
গতকালকে চিটাগাং-রোডে (নারায়ণগঞ্জ) কিছু একসেসরিজ ক্রয় করতে গিয়েছিলাম। দু'জন মুরুব্বি টুপি পরিহিত ছিলেন। সম্ভবত দু'জনেই নামাজ পড়ে বেরিয়ে একটু চা পান করার জন্য চা'র দোকানে বসেছেন। কথা বলতে বলতে এক পর্যায়ে একজন বললেন, ভাস্কর্য বিষয়ে সবাই কেমন জানি বাড়াবাড়ি করে ফেলতেছে। তখন অপরজন হঠাৎ ঐ মুরুব্বিকে বলছেন, তুমি তো ব্যাটা নাস্তিকদের চেয়ে খারাপ হয়ে গেছো। আরো কত বাজে কথা যে শুনতে হলো লোকটার!
শুনে খুবই খারাপ লাগলো। মোটামুটিভাবে তাদের কথার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সেখানে ছিলাম। প্রথমজন শুধু এটুকু বলেছিলেন। আমার  জানামতে, ইসলাম ধর্মের বিধি-বিধান অনুযায়ী কাউকে যত্রতত্র নাস্তিক-মুরতাদ বলা যাবে না; যতক্ষণ পর্যন্ত না সে নিজে স্বীকার করে নেয়। এমনকি জোর করেও কাউকে স্বীকার করানো যাবে না। নিষেধ আছে। শুধু শব্দগুলোর যত্রতত্র ব্যবহারের কারণে আজকে এ পরিস্থিতি। এক সময় ইহুদি-খ্রিষ্টান শব্দের যত্রতত্র ব্যবহার দেখেছি। সাধারণ জনতাও ধর্মীয় ইস্যূ আসলেই অন্যজনকে সহজে হেনস্থার উপায় হিসেবে শব্দগুলো ব্যবহার করতো।
ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসীদের বিশ্বাসানুযায়ী মানুষের প্রত্যেকটা কথার জন্যও শাস্তি বা সুখ প্রদান করা হবে।
দায়িত্বশীল ব্যক্তি হিসেবে তারা কখনো এর দায় এড়াতে পারেন না। আরো মার্জিতভাবে সকলের শব্দ ব্যবহারে সচেতন হতে হবে। কারণ, সাধারণের উপর তাদের প্রভাবটা বেশি। দেশের প্রেক্ষাপটে মানুষের উপর রাষ্ট্রযন্ত্রের চেয়ে ব্যক্তিগত জীবনে ধর্মের প্রভাবটা বেশি। এভাবেই গড়ে উঠেছে এখানকার সংস্কৃতি। রাষ্ট্রীয় ইস্যূতে সাধরণের প্রভাব ততটুকু যতটুকু তাদের প্রয়োজন। কিন্তু, ব্যক্তিগত জীবনে ধর্মের প্রবল প্রভাব বিরাজমান। ধর্ম এবং রাষ্ট্রযন্ত্র মুখোমুখি দাড়ালে তখন সবাই ধর্মের পক্ষে কথা বলেন। আবার ধর্মীয় ইস্যূর বাইরে সবাই দেশের পক্ষে এককাট্টা হন। অদ্ভূত একটা সংস্কৃতি ডেভেলপ করেছে। এদেশে ধর্মীয় আইন বাস্তবায়নের আন্দোলনে ধর্মীয় নেতাদের বাইরে সাধারণের অবদান সামান্যই। যতটুকু ধর্মীয় নেতাদের ইনফ্লুয়েন্স কাজ করে ততটুকুই। ব্যক্তিগত ধর্মীয় কাজের বাইরে ধর্মীয় বিষয়ে জোরালো কোন কাজ বা কথা বলতে কখনো এদেশে সাধারণের তেমন কিছু বলতে বা করতে দেখিনি। নামাজ পড়ে খাবার উৎপাদনই তাদের সারাদিনের প্রথম কাজ বলে তারা মনে করে। বিশ্বাস না হলে গ্রামে চলে যান; বাস্তবতা খুবই কঠিন; মুখে উচ্চকিত মানুষ কাজের বেলায় ঠনঠন। কারণ, সাধারণ মানুষ মনে করে ব্যক্তিগত শৃঙ্খলার জন্য ধর্মের যেমন প্রয়োজন; তেমনি মৌলিক অধিকারগুলোর প্রয়োজনে আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থারও দরকার। এজন্যই তো মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধা ও রাজাকারের উদ্ভব হয়। আমার জানামতে, ধর্মের প্রয়োজনে কিছু মানুষ মনে করে যে পাকিস্তানই ভালো (বাস্তবতাহীন ভাবনা ছিল; তখনও ধর্ম ছিল, এখনো আছে)। আবার অধিকারের প্রয়োজনে দেশের অধিকাংশ মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েন, দেশকে স্বাধীন করেন।
(ব্যক্তিগত অভিমত; দ্বিমত থাকতেই পারে এবং দ্বিমতকে অবশ্যই শ্রদ্ধা করি। দ্বিমত হলে, অবশ্যই সহনশীলতা ও সহিষ্ণুতার পরিচয় দিন। মুসলিম হিসেবে শিষ্টাচারই আমাদের প্রথম পরিচয়।)