অনেকে মনে করেন, ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা। এটা একটা ভুল ধারণা।
আবার, অনেকে মনে করেন। ধর্মনিরপেক্ষতা মানে নাস্তিকতা। এটা মহাভুল ধারণা।
আস্তিকতা বা নাস্তিকতা এ দুটো ধর্মীয় ধারণা। কিন্তু, ধর্মনিরপেক্ষতা হচ্ছে একটি রাজনৈতিক অধিকার সংক্রান্ত চিন্তাধারা। আস্তিককে নাস্তিক ভাবা যায় না; আবার, নাস্তিককে আস্তিক ভাবা যায় না। কিন্তু, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের কৌশল হিসেবে ধর্মনিরপেক্ষতা আস্তিক-নাস্তিকসহ সকল মানুষের সব ধরণের চিন্তাধারাকে শালীনতার মধ্যে স্বীকৃতি দেওয়ার একটি সর্বজনবিদিত রাজনৈতিক ধারণা। ধর্মীয় আইনের পক্ষপাতকে ধর্মনিরপেক্ষ আইন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়। অর্থাৎ, রাষ্ট্রের মত একটি জড় ভাবনার কোন ধর্ম থাকার প্রয়োজনীয়তা নেই বলে নিরপেক্ষতার দৃষ্টিভঙ্গিতে অধিকার সংক্রান্ত রাজনৈতিক চিন্তাধারা হিসেবে এর উৎপত্তি। রাষ্ট্রের গায়ে সুনির্দিষ্ট ধর্মের ট্যাগ দিলে একটা নির্দিষ্ট গোষ্ঠী (ঐ ধর্মের সকল ধর্মপ্রাণ মানুষ নয়) রাষ্ট্রীয় সব সুযোগ-সুবিধা ভোগের অলিখিত একচেটিয়া অধিকার পেয়ে যায়। যা ইতিহাস থেকে জানা যায়। কিছু কিছু অধিকারের ক্ষেত্রে ধর্মীয় আইন ভালো করলেও, পক্ষপাতহীন সমাজ প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হয়। ফলশ্রুতিতে, নতুন ধরনের অধিকার বিষয়ক এ রাজনৈতিক চিন্তাধারা আসে।
এটা সর্ব ধর্ম, মতবাদ, চিন্তাধারা প্রতিপালনের ক্ষেত্রে যেনো কোন গোষ্ঠী প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করতে পারে তার একটি রাজনৈতিক অধিকার সংক্রান্ত রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার কৌশল হিসেবে প্রায়োগিক দিক থেকে অন্যান্য আইনের চেয়ে এটা সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পারদর্শিতার পরিচয় দেয়।
কোন শ্রেণির বিশেষ কোন ধর্মীয় বা মতবাদের একক পৃষ্ঠপোষকতা করার কোন সুযোগ নেই। সমতার ভিত্তিতে বহুত্ববাদকে (সামাজিক শৃংঙ্খলা সংক্রান্ত) স্বীকার করে নেওয়ার অপর নাম ধর্মনিরপেক্ষতা।
এখানে ব্যক্তির চেয়ে রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার যায়গা অনেক বড়। ধর্মনিরপেক্ষতার সুযোগে কেউ যেন কৌশলে বা অতিকৌশলে নিজস্ব গোষ্ঠী চেতনা অপর কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর উপর চাপিয়ে না দিতে পারে তার উপর নজরদারি ও দুষ্টের দমন, শিষ্টের প্রতিপালন করাই রাষ্ট্রের অন্যতম কর্তব্য। অর্থাৎ, সবল মতবাদ যেন দূর্বল মতবাদের উপর খড়গহস্ত হতে না পারে; সে ব্যাপারে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা।
ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান অনুযায়ী মানুষ হিসেবে আপনার মত/পথকে যেমন রাষ্ট্র অধিকার হিসেবে বিবেচনা করবে; ঠিক তেমনি অপর ব্যক্তির ভিন্ন মত/পথকেও রাষ্ট্র অধিকার হিসেবে বিবেচনা করবে।
নাস্তিক যেমন আস্তিকদের চিন্তাধারাকে সম্মান জানাতে পারে না বা আস্তিকরা যেমন নাস্তিকদের বেঁচে থাকার অধিকার নেই বলে মনে করে বা ভিন্ন মত একে-অপরকে ঘৃণার চোখে দেখে, এ সমস্যার একটি সুশৃংঙ্খল শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক ও সামাজিক বিন্যাসের পথ হিসেবে ধর্মনিরপেক্ষতার উৎপত্তি।
এখানে আস্তিক, নাস্তিক বা বহুত্ববাদী মত/পথকে সংরক্ষণ করাই হচ্ছে রাষ্ট্রীয় ধর্মনিরপেক্ষতার অন্যতম স্বরূপ বা বৈশিষ্ট্য।
এটার দুটো দিক খুঁজে পেয়েছি।
এক. দৃষ্টিভঙ্গিগত। যেটা ব্যক্তি কেন্দ্রিক। যখন কোন ব্যক্তি মনে করেন যে সবারই সবার মত করে বেঁচে থাকার ও ধর্ম পালনের ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রীয় অধিকার রয়েছে। তখন ব্যক্তির দৃষ্টিভঙ্গি ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তাধারা দ্বারা অনুপ্রাণিত বলে মনে করা হয়। এখানে একজন নির্দিষ্ট ধর্মের অনুসারী তার নিজের ধর্ম শালীনতার মধ্যে থেকে, কাউকে হেয়/অবজ্ঞা না করে পালন করতে পারবেন; আবার, ঐ একই ব্যক্তি কোন রূপ অবজ্ঞা ছাড়া অন্যদের ধর্ম পালনের স্বাধীনতাকে স্বীকার করে নেন। আবার কেউ যদি ধর্ম পালনে আগ্রহী না হয়, তারও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের সুযোগ রয়েছে এখানে।
দুই. আইনগত। যেটা সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় ব্যাপার। এখানে রাষ্ট্র নিরপেক্ষ আইন দ্বারা ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, মত-পথ, ভিন্নতা নির্বিশেষে সকল মানুষের সুচিন্তা ও ধর্ম প্রতিপালনের অধিকার সংরক্ষণ করে। ধর্মীয় সমঝোতার কোন সুযোগ নেই এখানে। রাষ্ট্রে ধর্মপ্রাণ মানুষ থাকবে। কিন্তু, রাষ্ট্রের মত জড় ভাবনা হবে ধর্মহীন।
বাংলাদেশের কথা যদি বলা হয়, সেক্ষেত্রে এখানে মিশ্র একটি কালচারের উন্নয়ন ঘটেছে। এখানে মধ্যপ্রাচ্যীয় গোড়াবাদী চিন্তা-ভাবনা/ একেবারে আপদমস্তক পোশাকী সংস্কৃতি চলে না; আবার পশ্চিমা খুল্লাম-খোলা চিন্তা-ভাবনা বা খোলামেলা পোশাকী সংস্কৃতিও চলে না। সামষ্টিক মধ্যপন্থী শালীন চিন্তা-ভাবনা ও সাধারণ শালীন পোশাকী সংস্কৃতিই এখানকার সংস্কৃতি বলে সিদ্ধ। বুঝতে না পারলে, সাধারণ মানুষের সাথে সাবলীলভাবে মিশে দেখুন। নিজের কথা স্কিপ করে তাদের কথা শুনুন মনোযোগ দিয়ে। আশা করি বুঝতে পারবেন।
এজন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সবার জন্য প্রয়োগযোগ্য মধ্যপন্থী সেক্যূলার সংবিধান দিয়ে গেছেন। এখানে মুসলিমদের মধ্যেও আল্লাহ ও রসূল (সা) এ বিষয়ের বাইরে বহু মত-পথের লোক আছেন। একজন আরেকজনকে মানতে পারেন না। তাছাড়া, আরো অন্যান্য ধর্ম-বর্ণ, নৃগোষ্ঠীর লোক আছেন। তাদের বিষয়গুলোও দেখভালের বিষয় এ সংবিধানে রয়েছে। ধর্মীয় আইনের ক্ষেত্রে এ ধরণের অনেক বিষয় রয়েছে যেগুলো উপেক্ষিত হবে বা সেক্যূলার সংবিধান থেকে ধার করা লাগবে। কাজেই, আমাদের সব মানুষের মত-পথকে সম্মান জানানোর মত সংবিধান আছে। নতুন করে অন্য কোন আইন নিয়ে অসভ্যতা না করাই শ্রেয় হবে বলে বোধ করি।
আসুন সবাই মিলে দেশের উন্নয়নে কাজ করি। তাহলেই সবাই ভালো থাকবো। এমনকি স্ব স্ব ধর্মমতও সুষ্ঠভাবে পালন করতে পারবো। জীবনমান উন্নয়নের সাথে ধর্ম পালনের মানও জড়িত। কেউ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না করি।