সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

ঈশান কোণের ঈশানী


শুনেছি, আকাশের উদারতা নাকি মহান। তবুও কখনো কখনো তার হৃদয় কালো মেঘে ঢেকে যায়। অশ্রুসিক্ত হয়ে যায়। পোড়া মেঘ তাকে বৃষ্টিতে ভরিয়ে দেয়। আমারও তাই হয়। কখনো ভাবিনি বিয়োগান্তক কোন ঘটনা ঘটতে পারে, আমার হৃদয়ের সাথে। বাস্তবতার রূপ বড়ই রূঢ় হয় শুনেছি। কিন্তু এতটা হয়, জানতাম না।

পাখিটা রোজ সকালে নীড়ের বন্ধন ছেড়ে ডানা মেলে সামনে দিয়ে উড়ে যেত। রাস্তাটা একই বলে জানতাম। কিন্তু সে বা আমি কখনো জানতাম না যে চিরচেনা পথ দুমড়ে-মুচড়ে ভাগ হয়ে যাবে। আকাশটা উদার হলেও পৃথিবীটা একচোখা। হয় কেউ আপনার পক্ষে সাফাই গেয়ে চলে যাবে; নতুবা, বিরোধীতা করতেই থাকবে। বিষয়টা বিয়োগান্তক না হয়ে, মিলনের সুসমাধানের পথে কেউ এগিয়ে দেয় না এখানে।

ঈশানী। শরতের শুভ্র মেঘও হার মেনে যায়। সদ্য ফোটা শুভ্র গোলাপ। কৃত্রিমতা নেই। সবই প্রকৃতি প্রদত্ত।

দেখেছিলাম সেই চৈত্রের মেলায়। নম্র চোখাচোখি আর হৃদয়ের কোমলতায় বিয়োগ ঘটে সেদিন।

খোঁজ নিয়ে জানতে পারি। ঈশান কোনে বাড়ী। তাই তাকে ডাকতাম, ঈশান কোণের ঈশানী বলে।

যা হয় আর কি! তারপর থেকে ডানামেলা পক্ষীটাকে দেখার জন্য প্রত্যহ প্রভাতে পথে অপেক্ষা করতাম।

বহুবার চোখাচোখি হয়েছে। সে সময় হৃদয় ঝংকার মেরে উঠতো। ছুটির দিনে আকাশটা মেঘে ঢেকে যেত। ঈশান কোনে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বিষন্নতা জমা হয়ে বৃষ্টি হয়ে নামতো। বৃষ্টি থামতো পাখিটা যখন আবার চিরচেনা পথে উড়ে যেত। কি যে ভালো লাগত তখন। আকাশটা আবারো ঝলমলিয়ে রঙিন হয়ে উঠতো।

তখন উচ্চমাধ্যমিক শেষ বর্ষের ছাত্র আমি। কিশোর বয়সে আবেগের ঘনঘটা একটু বেশিই থাকে। ঈশানী তখন ক্লাস নাইনে পড়ে। বুঝতেই পারছেন, বয়সের টানের সাথের মনের টান মিলে একাকার। সেও বুঝতে পারতো। কিন্তু, চোখাচোখিতেই সীমাবদ্ধ একটা পথে আটকে গেলাম। দুনিয়াদারির অনভিজ্ঞ দুটো পবিত্র আত্মা এক হতে চায়। তবুও, কেন জানি অপরিচিত বিপত্তি এসে দাড়িয়ে থাকে সামনে।

বারবার ফিরে গেছি। তার কথা ভাবতে ভাবতে কল্পনার রাজ্য আমাকে বাস্তব দুনিয়ার সব গ্রাস করে নিতে থাকে। বাউণ্ডুলে হয়ে ঘুরে বেড়াই একা। ভবঘুরে ভাবুক টাইপের লোকে পরিণত হই। ভাবতাম, মনে হয় ভুতে ধরেছে। তাছাড়া, কি! মহা যন্ত্রনায় পড়ে গেলাম। না পারি ধরতে, না পারি ধরার আকাঙ্খা ছাড়তে।

একদিন সাহস করে বলেই ফেললাম। প্রতুত্তরটা হ্যাঁ বা না এর মাঝখানে আটকে গেল। দৃশ্যমান কিছু ভয়, উভয়কেই আটকে দিল। মন চায়, কিন্তু বন্য বিপত্তিগুলো চায় না। নতুন মুশকিলে পড়লাম। এর কোন সমাধান ছিল না।

তবুও, চেষ্টা করতে নেই মানা। আমি মনের জোর দিয়ে, বনের মহিষ তাড়ানোর চেষ্টা করতে থাকলাম। জানতাম, সেও তাই চায়। কিন্তু!

মনের ব্যবচ্ছেদ ঘটালো ধর্ম।
দুনিয়ার কোন আঠা এটা কিভাবে জোড়া লাগাবে তা অজানা। তবুও, পথের আড়ালে পথ খুঁজে ফিরি।

অবশেষে, একদিন আমরা লুকিয়ে দেখা করলাম।
সে বললো, 'দেখো আবিদ এটা কখনোই সম্ভব নয়। পক্ষপাতদুষ্ট সমাজ ব্যবধানটাই আসল মনে করে। মানুষ এখানে গৌণ হয়ে যায়। সুতরাং, চলো ফিরে যায়।'

বললাম, 'ছোট্ট জীবনে সৃষ্টিকর্তা তাহলে কেন আমাদের মনে ভালোবাসা সৃষ্টি করে দিলেন?'

বললো, 'এসবের কোন উত্তর সমাজ দিতে চায় না। সমাজ চায় ব্যবধান।'

বিমর্ষ বদনে ফিরে এলাম। দিনগুলো পানসে হয়ে উঠেছিল। পাগলের মত আচরণ শুরু করে দিলাম। যা মনে আসে তাই বলি। মাঝখান দিয়ে কবিতা লেখা শুরু করি। মনের যত যন্ত্রণা সব কবিতায় আশ্রয় নিতে থাকে।