আমাদের বাড়ি সাতক্ষীরা সদরে হওয়ায় ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতার সঙ্গে সাংস্কৃতিক ব্যাপারে অনেক কিছুর মিল রয়েছে। তাছাড়া, বহু বাঙালি মুসলমান রিফিউজি হয়ে এখানে চলে আসে; ভারত ভাগের সময় ও তৎপরবর্তী দাঙ্গা-হাঙ্গামার সময়গুলোতে। তাদের প্রভাব নিতান্তই কম নয়।
যাহোক, মেড ইন জাপানের তৈরিকৃত রেডিও ছিল আমাদের মত ৯০ দশকের শুরুতে জন্ম নেয়া ছেলে-মেয়েদের বিনোদনের মোক্ষম মাধ্যম। টেলিভিশনও তখন গ্রামীণ জীবনধারার সাথে অতটা খাপ খাওয়াতে পারেনি। তবে, সে সময় রেডিওর আলাদা একটা জৌলুস ছিল। রেডিও শুনে কল্পনার রাজ্যে ভেসে বেড়াতাম। মনে হতো আমি পক্ষীরাজ।
অল্প সংখ্যক সরকারী চ্যানেলে বহুসংখ্যক অনুষ্ঠান হতো। গানের অনুষ্ঠান দূর্বার, ছায়াছবির গানের অনুষ্ঠান। রম্য নাটক আয়নাতে ময়না ভাবি, ইজ্জত, সুরত আলীদের ঢঙের তালে অসঙ্গতিগুলো তুলে ধরা বেশ বোধে পেত। রমজান মাসে ইফতারের আগে ক্বারীদের কুরআন তেলাওয়াত, দোয়ার অনুষ্ঠান, রমজানের ফজিলত নিয়ে আলোচনাসহ সেহরির সময় নজরুলের গজল ও ফজিলতমূলক আলোচনা, পাঁচ ওয়াক্তের আজান শোনাসহ বিভিন্ন ঘরানার বাংলা গান; যেমন, রবীন্দ্র সঙ্গীত, নজরুল সঙ্গীত, লালন গীতি, ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালি, মুর্শিদি, বাউল গান, উচ্চাঙ্গ ও রাগ সঙ্গীত শুনে অনেকে উচ্চস্বরে রাগ করতো! বিশেষ দিনগুলোতে নাটক হতো। বিশেষ বিশেষ অনুষ্ঠান হতো। ভালো লাগতো দিনগুলো। আর ঈদের আগের সন্ধ্যাবেলা কবি কাজী নজরুল ইসলামের লেখা, 'ও মন রমাজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ'। গানটা শোনার জন্য এক প্রকার অধীর আগ্রহ নিয়ে বসে থাকতাম। বারবার শোনার জন্য চ্যানেল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চেষ্টা করতাম।
সম্ভবত ২০০৬ সালের দিকে অনেক চেষ্টার পর আব্বার কাছ থেকে ১৫০ টাকা নিয়ে এফএম রেডিও শোনার জন্য নতুন একটি স্যামকন এফএম রেডিও কিনে আনি। এর আগে অবশ্য জাপানের তৈরি একটা রেডিওতে বাংলাদেশের রেডিও চ্যানেলগুলো ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে শুনতাম। তখনকার দিনে বাংলাদেশে এফএম রেডিও শুরুই হয়নি। কলকাতাতে বেশ জোরেশোরে এফএম চ্যানেলগুলো কার্যক্রম শুরু করে দেয়। রাত জেগে আরজেদের কথা শুনতে খুবই ভালো লাগতো। মনে হতো আমিও যদি ওদের মত সাজিয়ে-গুছিয়ে সুন্দর করে কথা বলতে পারতাম। কতই না ভালো হতো। ঘরের চালের উপর এন্টিনা দিতাম। গাছের মগডালেও এন্টিনা তুলে দিতাম। বেশি বেশি চ্যানেল ধরার জন্য।
অনেকগুলো এফএম একটার পর একটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে শুনতাম। এখনো অনেকগুলো এফএম চ্যানেলের নাম মনে আছে আমার। যেমন, ৯১.৯, ৯২.৭ বিগ এফএম, ৯৩.৫ রেড এফএম, ৯৪.৩, ৯৮.৩ রেডিও মির্চি, ১০০.২ আকাশবাণী, ১০৪.০, ১০৪.৮, ১০৬.২ আমার এফএম, ১০৭.০ রেইনবো এফএম, ১০৭.৮ পাওয়ার এফএম। এর পর বাংলাদেশে ২০০৯ সালে প্রথম ৮৯.৬ মেগাহার্জসে রেডিও টুডে এফএম চালু হয়। তারপর, ১০২.০ তে বিবিসি, ৮৮.০ রেডিও ফুর্তি চালু হয়। এরপর কতশত এফএম চ্যানেল হয়েছে তা আর বলে শেষ করা যাবে না। অবশ্য শীতকালে চেন্নাই ও আসামের দু'একটা এফএম চ্যানেল ধরতো। ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সেগুলোও শোনার চেষ্টা করতাম। তাছাড়া, জাপানের এনএসকে ওয়াল্ড, চীন আন্তর্জাতিক বেতার কেন্দ্র, বিবিসি, ভয়েস অফ আমেরিকা, ভারতের আকাশবাণী কলকাতা, বাংলাদেশ বেতার খুলনা, ঢাকা ক, খ, গসহ বাংলাদেশ টেলিভিশনের অডিও ভার্সন শুনতাম রেডিওতেই। সে সময় টেলিভিশনও সবার ঘরে ঘরে ছিল না। রেডিও মোটমুটি অনেকের ঘরেই ছিল। বিনোদনের মাধ্যম বলতে আমাদের মত ৯০ দশকের গ্রামীণ ছেলে-মেয়েদের ছিল রেডিও আর বিটিভি।
তখনকার দিনে আরজেদের শো গুলোতে এক ধরনের অন্য রকম আকর্ষণ শক্তি ছিল। শ্রোতাদের ধরে রাখার এক অলৌকিক মেধা তাদের ছিল বলে মনে হয় আমার। নতুন নতুন গানের ঝোকে সারাদিন কানের কাছে এফএম চালু করে রেখে দিতাম। মায়ের বকুনিও কম শুনতে হয়নি এজন্য।
রাতের শো গুলো বেশি ভালো লাগতো। অঙ্ক করতাম আর এফএম শুনতাম। আহ্, কি দিন ছিল আমার। তখন তো আর ইন্টারনেট এত পর্যাপ্ত ছিল না। ওটাই ছিল সারাদিনের ধ্যান-জ্ঞান। গান, কথা, গল্প, সংবাদ সবই শোনা হতো। এমন হতো একবার যদি বই আর এফএম নিয়ে বসেছি, তাহলে এক বসাতে দিন পার হয়ে যেত। বুঝতেই পারতাম না কখন দিন শেষ হয়ে রাত চলে আসতো।
রঙ বে-রঙের কথার ফুলঝুড়ি আর নিত্য নতুন গানের তালে তালে ছন্দে বে-ছন্দে ঢঙে-লয়ে কথার মিশ্রণে মুগ্ধ হয়ে যেতাম আমি।
ভালোবাসা সকল কথাবন্ধু ও সে সময়কার সকল আরজেদের জন্য।
স্মৃতিগুলো হাতড়ে মরি। হাতড়ে তুলে এনেছি কিছু স্মৃতি। যাদের এ ধরনের চর্চা ছিল তারা বুঝতে পারে, স্মৃতিবহুল জীবনের কি মজা। সময়ের আলাদা একটা টান রয়েছে। আমি যখন কারো সামনে গল্পগুলো বলি, সাথে সাথে তারা কেমন যেন আপন শক্তিতে জ্বলে ওঠে। আমরা ৯০ দশকের শুরুতে জন্ম নেয়া ছেলে-মেয়েরা না বখাটেপনার খুব বেশি সুযোগ পেয়েছি, পড়ালেখা ছেড়ে না উচ্ছন্নে চলে গেছি। আমাদের জন্মের পরই শিক্ষা ব্যবস্থাসহ সব কিছুতে গুণগত পরিবর্তন শুরু হয়। এটা নিয়ে আমরা গর্ব করতেই পারি।