আমার মতে, বাংলাদেশের স্বনির্ভরশীল হওয়ার জন্য সব উৎসই এখানে বিদ্যমান। কিন্তু, আমরা নিজেদের উৎসগুলো ব্যবহারে মনোযোগী নই। যে কারনে পরনির্ভরশীলতা কাঁটাতে বারবার ব্যর্থ হচ্ছি। এখানে সবচেয়ে বাঁধা হিসেবে কাজ করে, আমাদের পরনির্ভরশীল মানসিকতা। আমাদের বাপ-দাদারা প্রায় সবাই কৃষক ছিলেন। তারা কিন্তু সবাই আত্মনির্ভরশীল ছিলেন। এমনকি তারা অধিকাংশই একাডেমিক শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন না। আমরা যারা ছাত্র, তারা প্রথমে পরিবারের উপরে নির্ভর করে পড়ালেখা করি; এরপর চাকরির উপর ভর করে জীবনটা পার করে দেই কেউ কেউ। বাকিরা পরিবারের বোঝা হয়ে থেকে যায় আজীবন। ঝাঁটা-লাথি খেয়ে জীবনটা পার করে দেয়। আসলে, আমরা শিক্ষার অন্তর্নিহিত বিষয়টি উপেক্ষা করি। যে কারনে আমাদের দৈন্যদশা ঘোচে না। বর্তমান সময়টা উদ্যোক্তাদের জন্য। এমনকি ভবিষ্যতও তাদের। একটু মনোযোগী হলে বিষয়টি অনুধাবন করতে পারবেন। যারা চাকরি করে, তাদের চেয়ে যারা শক্তিশালী ইনোভেটিভ আইডিয়া নিয়ে উদ্যোক্তা হওয়ার মনোবাসনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন, তারাই মানুষকে কিছু দিনের মধ্যে চাকরি দেয়ার সক্ষমতা অর্জন করছেন। বিশ্বাস না হলে অন্তর্জালে একটু ঢুঁ মেরে দেখুন। হাজার হাজার উদাহরন ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। একটা ছেলে বা মেয়ে পড়ালেখা শেষ করে তার ক্যারিয়ার উদ্যোক্তা হিসেবে শুরু করতে পারে, এটা যেন ভাবতেই পারেন না আমাদের তথা-কথিত আলগা সম্মানবিদ সমাজ। তারা চাই সবাই গতানুগতিক একটা চাকরি পেলেই জীবনটা সেটেলড। আমার কাছে, চাকরি মানে অন্যের জন্য নিজের সময় ও জীবনটা সামান্য কিছুর বিনিময়ে বিক্রি করে দেয়া। নিজেকে আরো বেশি বিকশিত করার সুযোগটা হাতছাড়া হয়ে যায়। এলাকার দু'জন মুরুব্বিকে জানি। যারা বাপ-দাদার অঢেল সম্পদ থাকার কারনে ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েও চাকরি করেননি; ব্যক্তি-স্বাধীনতা খর্ব হয়ে যাবে বলে। আজকে তাদেরকেই বলতে শুনি, যেভাবেই হোক ছেলের চাকরির জন্য বাপ-দাদার রেখে যাওয়া জমি বেঁচে ছেলে-মেয়ের চাকরির ব্যবস্থা করবেন। আমার মনে হচ্ছে, আমরা যতই একাডেমিক শিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছি ততই আমাদের স্বনির্ভর হওয়ার উৎসগুলোকে দূরে ঠেলে দিচ্ছি। দেশের প্রথিতযশা তিন-চারটে বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘুরে একটা বিষয় খুব স্পষ্ট বুঝেছি, ছাত্র-ছাত্রীরা অধিকাংশই অলস সময় বেশি অতিবাহিত করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ধারনা, তা থেকে তারা অনেক দূরে সরে গেছে। এ দায়টা কাদের? একটু বুদ্ধি থাকলে বুঝতে অক্ষম হবেন না! জাতি গঠনের দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ এক্ষেত্রে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছেন বারবার। এক্ষেত্রে শেষ ভরসা আমাদের মাননীয় সরকারপ্রধান। তিনি বারবার বলছেন মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির কথা। আমরা ভেবে বসে থাকি, তিনি সরকারী চাকরির ফর্দ নিয়ে বসেছেন। আসলে, তিনি উদ্যোক্তাবান্ধব অনেকগুলো পদক্ষেপ নিয়েছেন। আশাকরি, বাদবাকি যত সমস্যা রয়েছে সবগুলো বাঁধা দূর করে বাংলাদেশকে আরো বেশি স্বনির্ভর দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে সক্ষম হবেন। ইনশাল্লাহ্।
এখানে চাকরির পরীক্ষা নিয়ে কিছু কথা বলি। অনেককে দেখেছি, প্রস্তুতি ছাড়াই চাকরির পরীক্ষা দিতে যায়। প্রশ্ন করলে বলে, অভিজ্ঞতা অর্জন করতে যায় তারা। আরো আশ্চর্যজনক ব্যাপার হচ্ছে, তারা নিজেদের অক্ষমতা ঢাকতে সরকার, দেশ, পৃথিবী, জীবন ইত্যাদি নিয়ে আজেবাজে মন্তব্য ও হিজিবিজি কথাবার্তা বলে। আমি বলি কি ভাই, জীবন ও সময়ের মূল্য অনেক। অলস সময় নষ্ট না করে আল্লার উপর ভরসা রেখে কাজে নেমে পড়ুন। আল্লাহ আপনাকে নিরাশ করবেন না। একবার একজন বড় ভাই আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, বড় হয়ে কি হতে চাও? আমি বলেছিলাম, শিক্ষিত-উন্নত কৃষক হতে চাই। ভাই ও তার বন্ধুরা হাসি-ঠাট্টা করে আমার ইচ্ছাটাকে তাচ্ছিল্য করেছিলেন। অথচ, ভাইয়ের বাবা এলাকার একজন সম্মানিত কৃষক ছিলেন। কৃষকের ছেলে কৃষিকে অবজ্ঞা করে; এটা আত্মবিরোধী, আত্মবিধ্বংসী কাজ বলে মনে হয় আমার। আপনি ভাবছেন, আমার বাবা তো কৃষক নন; উচ্চপদস্থ চাকরিজীবী। ঠিক আছে, কিন্তু আপনার এথনিক অরিজিনে কৃষি লেপ্টে আছে পলেস্তরার ভেতরকার ইটের মত। উৎপাদশীল সেক্টরগুলোই একটা দেশেকে বাঁচিয়ে রাখে। আর কৃষি তো সরাসরি মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে। কালের যাত্রায় কৃষিই মানুষকে সভ্যতার পথে ধাবিত করে। আসুন, কৃষি ও কৃষককে সম্মান করি, ভালোবাসি।