সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

বিসাত্ যখন বিষাদ


গল্পটা এখান থেকে ১৫ বা ২০ বছর আগের। আমাদের এলাকার একজন ব্যক্তির হঠাৎ আঙুল ফুলে কলাগাছ অবস্থা। জমি কেনা, নতুন ইটের ছাদওয়ালা বাড়ি তৈরি, মোটরগাড়ি কেনা আরো নিত্য ফর্দ-ফরমায়েশ। চোখকে বিশ্বাসের কাঠগড়ায় নিয়ে যেতে পারছিলো না কেউ।

পাঁচ-ছয় বছরের মধ্যে কুঁড়ি-পঁচিশ বিঘা জমি কিনে ফেললো লোকটা। বয়সও বেশি না। কতই বা হবে আনুমানিক ত্রিশ-পয়ত্রিশ হবে। পড়ালেখাও খুব বেশি জানে না। এসএসসি পরিক্ষা দিয়ে পাশ করতে পারেনি। তাই আর পড়ালেখা করেনি বলে বলত সে। কুঁড়ি-বাইশ বছর বয়সে বিয়েও করে সে।

পরপর ৩ টা ছেলে সন্তান। প্রথম ছেলে সন্তান হওয়ার পর একটা মেয়ে সন্তানের আশায় পরে আরো ২ টা ছেলে সন্তান প্রসব করে তার বউ। এতে করে সংসারের আকারও বেড়ে যায়।

৪র্থ বারে তারা সফল হয়। তাদের ঘর আলো করে ভূমিষ্ঠ হয় এক কন্যা সন্তান। নাম রাখে ফাতেমা। মহা সমারোহে ছয় রাত পালন করে। এর ছয় মাস পরে গালে ভাত অনুষ্ঠান করে। দিন খুবই ভালো যাচ্ছিলো। বিপত্তি শুরু হয় যখন ৪ সন্তানে পড়ালেখা করতে স্কুলে যাওয়া শুরু করে তখন।

সন্তানদের পড়ালেখার পিছে খরচ করার চেয়ে জমি কেনাটা তার কাছে লাভজনক মনে হয়। তাই সে হাইস্কুল লেভেলে উঠার পর ছেলে-মেয়েদের পড়ালেখা বন্ধ করে দেয়। ছেলেরা অন্যের জমিতে দিনমজুর দিয়ে ইনকাম করে। নিজেদের জমিতেও কাজ করে। ভালোই চলছিলো। মেয়েটা ছিলো তার খুব আদরের। মেয়েটা ক্লাস এইটে পড়ার সময় একপ্রকার জোর করেই বিয়ে দেয়। চলছিলো ভালোই। কিন্তু, সমস্যা হলো জামাই বাবাজি একজন নেশাখোর। মাল-মুল খেয়ে মেয়েটাকে ভীষন মারধর করত। বাপের বাড়ি এসে বললে, বাবা খরচের ভয়ে মেয়েকে হুমকি ধামকি দিয়ে বলত, 'কপালে যা রাখছে আল্লাহ তাই হবে। সবই আল্লার ইচ্ছা। বিয়ে দিছি এখন তুমি যতটা না আমার মেয়ে তার থেকে বেশি তাদের বউ বা বউমা।' এই যুক্তি দেখিয়ে বিদায় করত।

মেয়েটা মারধরের দাপটে শ্বশুর বাড়ি টিকতে পারছিলো না। এদিকে বাপ-ভাইয়ের এখানেও যায়গা হলো না।

হঠাৎ একদিন শ্বশুর বাড়ি থেকে খবর আসলো আপনার মেয়ে খুব অসুস্থ্য হাসপাতালে আছে। লোকটা কোন জবাবও দিলো না। মেয়েটাকে দেখতেও গেলো না।

এরপর যখন খবর আসলো মেয়েটা তার মারা গেছে। তখন চুপিসারে গিয়ে কবরস্থ করার পরপরই চলে আসলো। যেন সে মুক্ত হলো। এর চেয়ে দুঃখের বিষয় মেয়েটা বাচ্চা হওয়ার সময় মারা গেছিলো। একটা সুন্দর ফুটফুটে ছেলে বাচ্চা রেখে মেয়েটা ইহজগৎ ত্যাগ করে। ডাক্তারেরা বলেছিলো, 'অল্প বয়সে বিয়ে দেয়ায় খিচুনি, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণসহ আরো অনেক ঝামেলায় মেয়েটা মৃত্যুবরণ করেছে।' মেয়েটা মারা যাওয়ার পর জামাইয়ের বাড়ি থেকে ইদুরের মত চলে আসে।

আগেই বড় ও মেজ ছেলে বিয়ে করে। আলাদা সংসার পাতানোর ধান্ধায় ছোট ভাইকে বিয়ে দিয়ে বাপকে বলে সব কিছু ভাগাভাগি করে দিতে। কিন্তু, বাপ এতে রাজি না হওয়ায়। অশিক্ষিত ছেলেরা বাপকে ঘরে বন্ধ করে রেখে নিজেরা ভাগ-বাটোয়ারা করতে থাকে। কোনভাবে বাপ ঘর থেকে বের হয়ে বড় ছেলেকে একটা থাপ্পড় মারে। মেজ ছেলেটা বাশ দিয়ে বাপের মাথায় এক বাড়ি দিয়ে বসে। বাপের মাথা দিয়ে অতিরিক্ত রক্ত ক্ষরন হয়ে মারা যায়।

তিন ছেলেকে পুলিশে ধরে নিয়ে যায়। সহায় সম্পত্তি এখন সব ভোগ করতে থাকে ছেলের বউরা। ছেলেগুলোর জেল হয় জরিমানা হয়। জমি বিক্রি করে জেল থেকে মুক্ত হয়ে ছেলেরা সব সহায়-সম্বলহীন হয়ে পড়ে। বুঝি, একেই বলে বিসাতের বিষাদ।