সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

৩০ দিনের একটি অসমাপ্ত প্রেম


(গল্প কিন্তু গল্পই। মিলে গেলে নিঃসন্দেহে তা কাকতালীয় বৈ কিছু নয়।)

বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাওয়ার পর সব কিছুতে নতুনত্বের ছোয়া কাজ করে। তখন অধিকাংশেরই ১৮ বছর পূর্ণ হয়। এ বয়সে সবারই সব কিছুতেই নতুনত্বের আভা বিকশিত হয়।

এর মধ্যে বড় পরিবর্তন ঘটে জৈবিক পরিবর্তন। যার সুত্র ধরে বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষন সৃষ্টি হতে শুরু করে। যদিও স্কুল-কলেজ জীবনে এগুলোর ছোয়া লাগা শুরু হয়। তারপর বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে এসে মোটামুটি একটা পক্বতার দিকে যাত্রা শুরু করে।

আর সবচাইতে বড় কথা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র ভাই-ব্রাদার। প্রেম ও জীবন সম্পর্কে তাদের এক এক মস্ত দর্শনের কবলে পড়ে জুনিয়ররা দিশেহারা হয়ে পড়ে। তাদের নিজস্ব দর্শন আরেকজনের উপর চাপিয়ে দিয়ে মজা নেয়া একটা প্রচলিত রীতি। তবে, বিপরীতে সবচাইতে মজার বিষয় কিছু ছোট ভাই এ সকল বড় ভাইদের চেতিয়ে মজা নেয়।

তো যাইহোক, অন্য সবার মত আমার বন্ধু সিয়াম ও আমিও এর বাইরে নয়। আমাদেরও একই দশা। প্রেম করা যেন বাধ্যতামূলক হয়ে দাড়াল জীবনে। চেষ্টার কমতি নেই। কোন মতে একটা সুন্দরী মেয়ের সাথে জমিয়ে কথা বলাতে পারলেই নিজেকে ধন্য মনে করতাম। প্রেম সম্পর্কে আমার তেমন কোন ধারনা ছিল না। বন্ধুবান্ধব যা বলত তাই বিশ্বাস করতাম। সেগুলো মেনে চলার চেষ্টা করতাম প্রেমের ব্যাপারে।

ক্যাস্পাসে একটা রীতি প্রচলিত হলো কোন সেম ইয়ার মেয়ে সেম ইয়ারের ছেলের সাথে প্রেম করতে চায় না। দু'একটা ঘটে। কিন্তু, ব্যতিক্রম কখনো উদাহরন হয় না।

তাই বাধ্য হয়ে আমরা এলাকার দিকে ইন্টার পড়ুয়া মেয়েদের সাথে ভাব-জমানোর চেষ্টা করতাম। ঘনঘন বাড়ি আসা এটার পেছনে একটা বড় কারন ছিলো। বাড়ি অনেক দূর হওয়ায় মোটামুটি এক সপ্তাহের ছুটি পেলেই বাড়ির উদ্দেশ্যে যাত্রা করতাম। আমার এক ছোট ভাই আছে সে বলে, আমি ভাই ক্যাম্পাসে আসি বাড়ি যাওয়ার জন্য। বিষয়টা বুঝে নেন।

তখন ফাস্ট ইয়ারে পড়ি। ঐ যা হয়! ছুটিতে বাড়ি। হঠাৎ একদিন এলাকার রাস্তায় বসে গান শুনছি। তখন দু'টো মেয়ে পাশ দিয়ে চলে গেলো। পাশে বসা ছিলো এলাকার এক ছোট ভাই। বললাম,

'কে রে মেয়েটা?'

'কোন মেয়েটা ভাই?'

'ঐ যে গেলো!'

'জানি না, ভাই!'

'খোজ নিয়ে দেখ তো! কে?'

'ঠিকাছে, ভাই।'

এরপর খোজ নিয়ে জানা গেলো বাড়ির পাশে প্রতিবেশী খায়ের চাচাদের আত্মীয়। চাচীর বোনের মেয়ে। এর আগে কখনো দেখিনি মেয়েটাকে। আজকেই প্রথম দেখলাম। দেখে ভালো লাগলো। নিজের ভেতর তার প্রতি একটা আকর্ষন অনুভব হলো। চাচাতো বোনকে বললাম। সে বললো হবে না। যা হয় আর কি! রীতিমত যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলো। ফোন নম্বর যোগাড় করার জন্য। এই জমানায় প্রেম-ভালোবাসা করার জন্য খুব বেশি ঝামেলা পোহাতে হয় না। এ জন্য এখন মানবিক প্রেমের চেয়ে প্রেমের জৈবিক দিকটাই বেশি চাঙ্গা। সহজবোধ্য জিনিসের যা হয়; সেরকমই।

অনেক চেষ্টা করার পর সম্মত হলো কথা বলতে। আমি তো ভীষণ খুশি। আরো একটা বিষয় আমাকে সে ফোন দিয়ে অন্য একটা নম্বর দিলো যে কথা বলার জন্য ঐ নম্বরে কল দিতে হবে। তবে, শর্ত একটাই। সে যখন কল দিবে তখন কথা বলতে হবে। মেনে নিলাম। প্রথম প্রেম বলে কথা। আবেগ, উত্তেজনা টানটান। আবেগের টানে নাচতে মুঞ্চায়ছিল।

সে যাইহোক, এর পর প্রায় প্রতিদিন ফোনে কথা হতো দু'জনের। কিন্তু সমস্যা হলো তার কোন নিজস্ব ফোন ছিল না। তবুও, তার আম্মুর ফোন দিয়ে কথা চলতো। এক প্রকার চুরি করেই প্রেম করা বলা চলে। ডেটিং-সিটিং সেভাবে হয়নি। মাত্র দু'তিনদিন। তাও একটা দুরত্ব ছিলো। এ দুরত্বটা একজন মানুষ। তবে, এ মানুষটা আমাদের অনেক সহযোহিতা করেছিলো। চাচাতো বোনটা নয় কিন্তু। অন্য কেউ।

সে সময় ফোনের ব্যালান্স থাকতো অলটাইম। ঘন্টার পর ঘন্টা কথা হতো। কিন্তু কেউ জানতো না।

ভালোবাসা-বাসির গল্প। কার কি ভালো লাগে থেকে শুরু করে জীবনে কি করব সব সাজিয়ে ফেলতাম কল্পনার জগতে দু'জনে মিলে। যদিও পরিনতিটা সুখকর ছিলো না। মানুষের ভালো লাগাটা আসলে ক্ষনস্থায়ী। এভাবে কথা চলতে চলতে ওর মা জেনে ফেলে বিষয়টা। মা বলে পড়ালেখা শেষ করে কিছু একটা করতে। তারপর দেখা যাবে। আমি আবার খানিকটা তাত্ত্বিক মানুষ আকাল-সকাল। ওসব শুনে ভালো লাগা উবে যায়। ভাব-ভালোবাসা তলানিতে চলে যায়। তারপরও চলছিলাম ভালোবেসে। হঠাৎ, একদিন ফোনের ওপাশ থেকে খুব মৃদু স্বরের কণ্ঠস্বর থেকে ভেসে আসে, 'আপনি আমাকে আর কোন দিন ফোন দিবেন না। আপনার দেয়া গিফ্টগুলো ফেরত নিয়ে যাবেন। আমি একজনকে দিয়ে পাঠিয়ে দিবো।' বললাম, 'তার আর দরকার হবে না। ওগুলো তো আমি ব্যবহার করতে পারবো না। আর আমার ২য় কোন অপশন নাই যে তাকে দেবো।'

প্রথম প্রেম তো ভালোবাসতাম মেয়েটাকে। খাদ ছিলো না কোন।

এভাবে শেষ হয় ২৮/২৮ এর প্রেম। মানে ৩০ দিন অর্থাৎ এক মাসের প্রেম। কষ্ট পেয়েছিলাম অনেক। বুঝতে পারিনি জীবনের প্রথম প্রেমের পরিনতিটা এভাবে এত দ্রুত হবে; অসমাপ্ত থেকে যাবে সব। যাহোক, অনেক কষ্টে পরবর্তী দিনগুলো পার করে নিজেকে সামলে নিয়েছিলাম।