(গল্প তো গল্পই। সবই কাল্পনিক এখানে। মিলে গেলে তা নিঃসন্দেহে কাকতালীয় বৈ কিছু নয়।)
নদীর ধারে গেলে মন ভালো হয়ে যায়; বলেছিলেন গুরু। এটা শুনে আমার প্রায়ই মন খারাপ হতো; কারনে অকারনে। মন ভালো করতে তাই প্রায়ই ছুটে যেতাম নদীর তীরে।
একদা কোন এক রমনীযুগল হেঁটে যাচ্ছিলেন পাশ ঘেঁষে। এরপর মাঝে-মধ্যে ঐ পথে তাদের সাথে প্রায়ই দেখা হতো। শরমের মাথা কাঁটা। আর দিব্যি তারা হা করে তাকিয়ে থাকে আমার দিকে। আমিও একদা অভ্যস্ত হতে থাকি এতে। তারপর কতশত চখাচখি। বন্ধু-বান্ধব কম। ইন্ট্রোভার্ট। তাই বেশিরভাগ সময় একাকী ঘুরে বেড়ায়। গুরুর বাণীতে নদী আমার বন্ধু হয়ে ওঠে।
আপন মনে উদ্ভট সব কল্পনার কলকাকলিতে আনমনে একদা হেঁটে চলেছি নদী তটে। হঠাৎ চাহনিতে চোখ-টিপুনি। আমি তখন হতচকিত হয়ে না দেখেছি ভান করে চলে যবো এমন সময় কন্যাদ্বয়ের একজন বলল, "এই যে জনাব এদিকে একটু আসেন।" বয়সে জুনিয়রই হবে।
অন্য সবার মত আমিও তখন ইতি-উতি তাকাতে থাকলাম। শরম সম্পন্ন ছেলেদের ক্ষেত্রে একথা মনে হয় শতভাগ খাঁটি। তারপর কন্যাদ্বয়ের একজন বলল, "আপনার ফোন নম্বরটা দেন।"
কিছুই বুঝলাম না। না শুনে, বুঝে ডিরেক্ট ফোন নম্বর। একটু অবাকই হলাম তখন। আমি তখন জিজ্ঞাসিত চক্ষে। সে বললে, "উহুম আপনাকে এখন কিছু বলব না। সব ফোনে হবে।"
আমি ভাবলাম সে কি ফন্দি-ফিকিরবাজ। ঐ যা হয় আর কি! আপ্সে যা আসে তাতো আর সবাইই হালাল ভাবতে পারে না। কেউ কেউ পুলিশের চোখেও দেখে থাকে কখনো-সখনো।
সাত-পাঁচ ভাবছি। এমন সময় হাত থেকে ফোন উধাও। দেখি কন্যাদ্বয়ের মধ্যে একজন আমার ফোনটা টিপাটিপি করছে। নিজের ফোনে একটা কল দিয়েই কেঁটে দিয়ে ফোনটা সটান আমার হাতে।
সব কিছু দেখে এবার হতভম্ব। কি যে হয়। আর কি যে আছে কপালে। কেন গুরুর কথা শুনতে গেলাম। আজকাল মনে হয় গুরুর বাণী শিরোধার্য হয় না। মানে খাটে না। ভুয়া।
তারপর ফোনটা না পাওয়ার ভয়ে ছিলাম। পেয়ে দ্রুত প্রস্থান করলাম। এরপর কয়েকদিন আর যাওয়া হয় না প্রিয় নদী তটে।
হঠাৎই একদিন বন্ধুবর সোহানকে নিয়ে ঘুরতে গেলাম ওখানে। বসে গল্প-গুজব করছি। হঠাৎ ফোন বাজছে। অপরিচিত নম্বর থেকে। ধরতে সংকোচবোধ হচ্ছিলো। তবুও, ধরলাম। পরিচিত কণ্ঠ। তবুও, বুঝতে পারছিলাম না। কারন, মেয়ে কণ্ঠ।
আমার তো ফোন দেয়ার মত কোন মেয়ে-বন্ধু নেই। যে ফোন দিবে। তারপর কোন সৌজন্য প্রকাশ ছাড়াই বলল, "আপনার পাশের ছেলেটা কে?"
আমি ভাবলাম আশপাশ থেকে কেউ মনে হয় দেখেই এমন করছে! ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি কেউ নাই। তাহলে কে হতে পারে বন্ধুকে ইঙ্গিতে জিজ্ঞাসিলাম। কোন সদুত্তর না পেয়ে বললাম, "কে আপনি?" বলল, "বুঝছি!"
"কি বুঝেছেন শুনি?" ফোনে এমন জবাব শুনে বলল, "সামনাসামনি তো এমন কখনো হয়নি।"
মনে মনে ভাবছি যে কে হতে পারে। "সামনাসামনি এমন হয়নি বলে।" নিশ্চয়ই পরিচিত। না হলে কেউ ঢপ মারছে। শেষে বললাম, "আচ্ছা, আপনি কি দয়া করে আপনার পরিচয়টা দেবেন? না হলে দয়া করে ফোনটা রাখেন। প্লিজ! আমি অপরিচিতের সাথে কথা বলে ফোনে সময় নষ্ট করি না।"
"থামেন মিয়া। চটাং চটাং কথা তো ঠিকই বলতে পারেন। ডানে ঘোরেন!"
ডানে-বায়ে ঘুরে ফিরে দেখে বললাম, "কই কিছুই তো দেখছি না! আরে মিয়া, আপনার পাশে ডান সাইটে রাস্তার যে হালকা বাকটা আছে ওটাই এসে দেখেন।"
"আশ্চর্য! আমি কেন ওখানে যাবো। আমার কি লাভ ওখানে গিয়ে। দরকার নাই।"
"লাভ নাই। লাভ পরে। আমার দরকার আছে। আসেন।"
"এই মেয়ে শোন, তোর সাথে আমার ফালতু বাকওয়াচ করার সময় নেই। যা ফোট।"
এই বলে ফোন কাটতে যাবো এমন সময়, "একজন সিনিয়ারের সাথে কিভাবে কথা বলতে হয় জানেন না নাকি শিখেন নাই।"
ফোন কাঁন থেকে নিচে অর্ধনামা করেছি, কাটতে যাবো এমন সময় "থামেন থামেন, আমরা এখানে আপনার জন্য অপেক্ষা করছি।"
বন্ধুবর সোহান এতক্ষন আমার কীর্তিকলাপ দেখে মুচকি হাসি দিতে শুরু করেছে। আমি তার দিকে তাকাতেই বলল, "যা। দেখ কি বলে।"
"আশ্চর্য! একটা অপরিচিত মেয়ে ফোন দিয়ে এই নির্জন যায়গায় ডাকছে। আর আমি ওমনি চলে যাবো। মগের মল্লুক নাকি।"
"আরে যা! আমি তো আছি।" বন্ধুর কথায় ভরসা পেয়ে চলে গেলাম। বাক পার হয়েই দেখি, কন্যাদ্বয় ডাবল থেকে ত্রিপল হয়ে আছে।
মূলত এই বয়সে অনার্স সেকেন্ড বা থার্ড ইয়ারে পড়ে বাইক চালানোটা মহত্বের নয় বঁটে। তাই আমরা মাউন্টেন সাইকেল চালায় আর এখানে ওখানে ঘুরে বেড়ায়। ভয়ে শখের বাই-সাইকেলটা সাথে নিলাম না। যদি কিছু করে।
কাছে যাচ্ছি সাবধানে। এমন সময় ত্রিপলের একজন বলল, "শুনেছি, আপনি নাকি খুব শরমওয়ালা ম্যান। কথা শুনে তো অন্য কিছু মনে হচ্ছে।" এরপর বলল, "প্রেম করেন কয়টা?"
বন্ধুবরের উপর ভিষণ রাগ হচ্ছে। আসলাম একটু মন ভালো করতে। তার মধ্যে এই ক্যাঁচাল।
"কি মিয়া কিছু বলেন না কেন? আমার প্রশ্নের উত্তর দেন?"
আমি বললাম, "কি যা তা বলছেন? আমি কোন প্রেম-ট্রেম করি না।"
"আপনাকে তো দেখে মনে হয়, আপনি প্রেম চোরা।"
"আজব! আর আমি মিয়া না! আমার নাম শোয়েব।"
কন্যাত্রয় একত্রে হেসে বলল, "সোজা হয়ে হাটতে পারেন না নাম তার শোয়েব।"
সঙ্গীদের হাসি থামিয়ে দিয়ে জিজ্ঞাসাকারী কন্যা বললে, "আমি জানি আপনি শোয়েব। এও জানি আপনি অনার্স সেকেন্ড ইয়ারে পরীক্ষা দিয়ে থার্ড ইয়ারে উঠার কাছাকাছি। মানে রেজাল্ট দেয়নি।"
আশ্চর্য! মনে মনে বললাম, "এ এত কিছু জানলো কি করে।"
তারপর বললে, "আমি রাণী। এ হচ্ছে আমার খালাতো বোন শর্মী (গতদিন যে আমার ফোন নম্বর নিয়েছিলো)। আর ও হচ্ছে আপনার বন্ধু সোহানের গার্লফ্রেন্ড নীলা"
আজকালকার মেয়েগুলো কত প্রাগ্রসর। ছেলেদের সাথে কোন রকম সংকোচবোধ ছাড়ায় অবলীলায় মিশে যায়, কথা বলে! ডিজিটাল প্রযুক্তির যত না উপকার তার থেকে বেশি অপকারে মানুষ ঝুকে যাচ্ছে। পড়ালেখা বাদ দিয়ে, মানুষের সাথে সামনাসামনি মেলামেশা না করে সারাদিন ফেসবুক নিয়ে পড়ে থাকে। এতে করে তাদের প্রাইমারি কালচারে নেতিবাচক বিষয় ঢুকে পড়ছে। বিভিন্নজনের পোস্টে গালি-গালাজ থেকে শুরু করে কত নেতিকথা, কটুকথার বহিঃপ্রকাশ তারই প্রমান বহন করে।
যাহোক, এবার বুঝছি। বন্ধুবরেরই সাজানো নাটক। তানাহলেও সে জড়িত।
বললে, "আমি অনার্স ফোর্থ ইয়ার নিউ। আমি আপনার সবকিছুই জানি। আপনি আমার সম্পর্কে কিছুই না জানলেও আমি জানি।"
"কিভাবে?"
"ওটা আর শুনতে হবে না! আমি যা বলি মন দিয়ে শোনেন। আজকে রাতে আপনাকে আমি ফোন দিবো। রিসিভ না করলে খবর আছে।"
"আশ্চর্য! আমি আপনাকে চিনি না জানি না। আমি আপনার ফোন রিসিভ করতে যাবো কেনো? আর আমার সমস্যা আছে। ফোন রিসিভ করতে পারব না।"
"কেনো? আপনার কি বউ আছে নাকি?" বলতেই তিনজনই হাসাহাসি শুরু করে দিলো। মনে হচ্ছিলো, একা পেয়ে চারজনে বিনোদনমূলক ব্লাকমেইল শুরু করে দিছে।
"যাইহোক, দিনের আলো কমতে শুরু করেছে। আমরা এখন চলে যাবো। আপনি কথামত কাজ করবেন। নইলে খবর আছে বলে দিলাম।"
কি আজব! এরা কি খুব পাওয়াফুল নাকি। ফোন রিসিভ না করলে খবর আছে।
মনে মনে ভাবলাম বাড়ি গিয়েই ফোন বন্ধ করে রাখবো। দেখি কি খবর করে আমার। বন্ধুবরকে নিয়ে ফেরার সময় তাকে বললাম, "তুই এমন একটা কাজ করতে পারিস। এটা আমি কোন মতেই ভাবতে পারছি না। দোস্ত!"
আমার দিকে ভ্রুকুটি দিয়ে তাকিয়ে বলল, "আমি আবার তোর কি করলাম।"
একটু কটুহাসি দিয়ে বললাম, "সব জেনেও না জানার ভান করিস কেনো?"
ও সাইকেলে ব্রেক মেরে দাড়ালো। বলল, "আচ্ছা, ওরা যে তোকে ডাকলো তার কিছুই তো বললি না?"
একটু আশ্চর্যই হলাম। বললাম, "অভিনয় তো ভালোই শিখেছিস।"
এবার বন্ধুবর একটু বিগড়ানো মেজাজে বলল, "কি হয়েছে বলবি তো। না বললে বুঝব কি করে।"
তা ঠিক। আমি তো ওকে কিছুই বলিনি। তাহলে বলে দেখি কি বলে। এই ভেবে ওকে সব বললাম।
একটা যায়গায় গিয়ে ও আশ্চর্য হয়ে গেলো। নীলা ওর গার্লফ্রেন্ড এটা সে কোনমতে স্বীকার করতে চাইলো না।
বলল, "ও আমার গার্লফ্রেন্ড হতে যাবে কেন? প্রশ্নই আসে না। আমি তাকে কখনো দেখিনি। জানিও না চিনিও না।"
আমিও অবাক হলাম। বিষয়টা কি? কোন একটা গড়বড় চলছে। এমন তো হওয়ার কথা না।
রাতে ফোন বন্ধ করার খায়েশ বন্ধ হয়ে গেলো। বিষয়টা কি একটু খতিয়ে দেখতে হবে। ওখান থেকে দু'বন্ধু মিলে বাজারে গেলাম। চা খেলাম। হালকা নাস্তা করলাম। তারপর দু'জন দু'জনের বাড়ি।
রাতে পড়ছি। সাধারনত একটু রাত করেই ঘুমাই। সাহিত্যের ছাত্র। রাত করে গল্প পড়াটা অভ্যাসে পরিনত হয়েছে। নতুন পুরাতন সব ধরনের গল্পই পড়ি। তবে, পুরাতন গল্পই বেশি টানে। একে তো ইন্ট্রোভার্ট। তার উপর সাহিত্যের ছাত্র। কোথায় যেন একটা সাংঘর্ষিকতার গন্ধ বিরাজ করে। কে যেন বলেছিলো, "উদারতা ছাড়া মহৎ সাহিত্য রচিত হয় না।" কিন্তু, আমি তো ইন্ট্রোভার্ট। পড়ছিলাম বেগম রোকেয়ার অবরোধবাসিনী সাথে ছিলো রবী ঠাকুরের গল্প গুচ্ছ। গল্প গুচ্ছের 'দেনা-পাওনা' পড়ে ভাবছিলাম। আহ্ নারী সমাজের কি দুরাবস্থা। এমন সময় ফোনটা বেজে উঠল।
ভাবলাম, খবরদারীর খবর মনে হয়। না এটা আরেক নম্বর থেকে কল আসছে। রিসিভ করে কথা বলতেই, "হ্যালো, আমি রাণী বলছি। আপনি কি করছেন?"
প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বললাম, "আপনার সমস্যা কি? কি চান আপনি?"
বলল, "আপনার ফেসবুকের এড্রেসটা দেন। আপাতত ওটাই চাই।"
"না হবে না। মানে আমি ফেসবুক চালাই না। গল্প, কবিতার বই লাগলে বলেন। কালকে আপনার ঠিকানায় দু'খানা পৌছে দেবো।"
"ঐ মিয়া সাহিত্যের ছাত্র হয়ে এত এনালগ কেনো আপনি। ডিজিটাল যুগে এনালগ মানুষ।"
"আমি এনালগ হলে তাতে আপনার সমস্যা কি?"
"সমস্যা আছে!"
"কি সমস্যা শুনি?"
"বলব না।"
"থাক বলতে হবে না। আপনি ফোনটা রাখেন। আমি আমার হাতের গল্পটা পড়ে শেষ করি।"
"কি গল্প পড়েন?"
"রবী ঠাকুরের "দেনা-পাওনা" পড়ি।"
"এখানেও আপনি এনালগ।"
"দেখুন, এসব মানুষের রুচিবোধের উপর নির্ভর করে। আমি একটু ইন্ট্রোভার্ট টাইপ। ওল্ডার জিনিসই বেশি টানে আমাকে। ফোন রাখেন।"
"আচ্ছা ঠিক আছে ফোন রাখছি তবে আপনার ফেসবুক এড্রেসটা দেন।"
আমি অনেক আগে একটা একাউন্ট খুলেছিলাম। তার পীড়াপীড়িতে ওটাই তাকে দিয়ে দিলাম। রহস্য উদঘাটন করার তাগিদে দিতে বাধ্য হলাম। তেমন চালানো হয় না ফেসবুক। তবুও সকালে ঘুম থেকে উঠে ফেসবুকটা অন করলাম। ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট বারে গিয়ে দেখি অজস্র ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট আছে। সবার উপরেরটার নাম লামিয়া রাণী। বুঝে গেছিলাম এটা তারই আইডি।
একসেপ্ট করলাম না। রাতে ফোন আসলো। রিসিভ করলাম না। কয়েকবার দিলো। রিসিভ করলাম না। সাইলেন্ট করে রাখছিলাম।
সকালে উঠে দেখি ৩৩ বার মিসডকল্ড হয়ে আছে। একবার বাদে সব ক'বারই ঐ নম্বর থেকে। একবার খালি বন্ধুবর সোহানের কল। কল না মিসডকল্ডই হবে। কারন, সোহান দরকারে কল দেয় না। মিসডকলই দেয়। তারপর আমি কল দিলে বলে, "কোন খোজ খবর নাই। ভুলে গেছিস।"
ফেসবুকে ঢুকে দেখি, রাতের প্রত্যেক ঘন্টায় একটা করে মেসেজ এসেছে মেসেঞ্জারে। ফ্রম লামিয়া রাণী। একটাই কথা লেখা। সকালে উঠেই যেন আগে আমি কল করি। ধুর বলে হাত-মূখ ধুয়ে নাস্তা করে বাজারে গিয়ে চা'র দোকানে বসে আছি। এমন সময় বন্ধুবর হন্তদন্ত হয়ে এসে বলল,"তোর জন্য একটা দুঃসংবাদ আছে!"
আমি বললাম, "আমার জন্য আবার কিসের দুঃসংবাদ!"
"সাইডে চল। সব বলছি।"
সাইডে না গিয়ে বাজার থেকে বের হয়ে ফাঁকা যায়গায় গিয়ে বললাম, "কি দুঃসংবাদ এনেছিস বল।"
"দোস্ত, রাণী খুব অসুস্থ্য।"
আমি বললাম, "রাণী কে?"
"দেখ দোস্ত, ন্যাকামি বাদ দে। এই নে ১০০ টাকা দিলাম। এটা নিয়ে মেডিকেলে চলে যা সোজা। ওখানে গেলে বুঝতে পারবি। তুই যেতে লাগ। আমিও কিছুক্ষন পরে আসছি।"
"চল একসাথে যাই।"
"না তুই আগে যা!"
"আজকে আবার কোন নাটক হচ্ছে না তো।"
"নারে না। তুই দ্রুত যা। দেরি করিস না। দেরি করলে ফেসে যেতে পারিস।"
এই শুনে হন্তদন্ত হয়ে সোজা মেডিকেলে চলে গেলাম। রিসিপশনে নাম বলতেই পাঠিয়ে দিলো কেবিন নং ৩৩ এ। কেবিনের সামনে যেতেই দেখি ৩ জন লোক বাইরে দাড়িয়ে আছে খুবই বিমর্ষ বদনে।
আর রাণী সেন্সলেস হয়ে শুয়ে আছে কেবিনের উপর। ৩ জনের একজন মহিলা বললেন, "বাবা তুমি কি শোয়েব?"
রাণীর এ অবস্থায় দেখে আমি কেমন জানি ভেতরে ভেতরে বিচলিত হতে থাকলাম। ভেতর থেকে বোবা কান্নারা কানাকানি করতে শুরু করে।
আমি বললাম, "জ্বি হ্যাঁ! কেনো?"
উনি শাড়ির আঁচল থেকে কি যেনো একটা বের করে আমার হাতের মুষ্টির মধ্যে দিলেন। খুলে দেখি একটা চিঠি। চিঠিতে কিছু বাক্যে লেখা,
প্রিয় শোয়েব,
তোমাকে অনেক দিন ধরে কলেজে ফলো করি। এক পর্যায়ে তোমার প্রতি দূর্বল হয়ে পড়ি। তাই তোমার খোজ-খবর নিয়ে জানতে পারি তুমি আমার এক বছরের জুনিয়র। তবুও, আমার কিছু করার ছিলো না। তবে, এটাও জানতে পারি তোমার পড়ালেখায় বড় ধরনের একটা গ্যাপ ছিলো। তাই সাত-পাঁচ না ভেবে সিদ্ধান্তটা নিয়ে ফেলি। খালাম্মার বাড়ির এলাকায় হওয়া খালাতো বোনের দিয়ে তোমার নম্বরটা ম্যানেজ করেছিলাম। কিন্তু, তখন কথা না বলে সামনাসামনি বলার সিদ্ধান্ত নিই। এবং সে মোতাবেক আগাচ্ছিলো। হঠাৎ, গতকাল তোমার ফোন না ধরাকে কেন্দ্র করে আমি বিচলিত হয়ে পড়ি। আমার আবার একটুতেই রেগে যাওয়ার অভ্যাস আছে। রেগে গেলে অজানা রোগে অজ্ঞান হয়ে যায়। হুশ ফিরতে ৫/৬ ঘন্টা লেগে যায়। ভালোবাসি অনেক তোমাকে।
ইতি,
লামিয়া রাণী।
এরপর আমি পুরো টাস্কি খেয়ে গেলাম। রাণীর কেবিনে ধপাস করে বসে পড়ি। রাণীর বাবা আমার পিঠে হাত দিয়ে আস্তে আস্তে শান্তনা দিলেন।
এর মধ্যে বন্ধুবর এসে হাজির। বাইরে দাড়িয়ে লাগাতার ফোন দিতে শুরু করলো। রিসিভ করছি না দেখে মেসেজ দিল। "কি ব্যাপার? কোন সমস্যা?"
"না। তুই ৩৩ নং কেবিনে আয়।"
এরপর যা হওয়ার তাইই হলো। আমার মা-বাবাকেও সোহান খবর দিয়ে ডেকে নিয়ে আসে। বাবা একটু রাগি মানুষ। তার সামনে কোন কথা বলার এখতিয়ার নেই আমার। সাথে করে রাণীর কেবিনে চলে আসলো। দেখে মনে হচ্ছিরো সোহান সব কিছু বলেই নিয়ে আসছে।
এরপর আর কি! লামিয়া রাণী থেকে আমার রাণী হয়ে গেলো। ধীরে ধীরে সুস্থ্য হয়ে উঠলো। প্রথমে বাবা একটু দ্বিমত করলেও পরে দুই পরিবারের সম্মতিতে বিয়েও হয়ে গেলো। পড়ালেখা শেষ। একটা ছোটখাটো জব করি। এখন আমাদের একটা ছেলে বাচ্চা হয়েছে। সুখি পরিবার। ইন্ট্রোভার্টিজম কমে গেছে। সব মানুষের সঙ্গে মিশতে পারি।