(এই লেখাটা আমার একজন খুব কাছের শুভাকাঙ্খীর কাছ থেকে শোনা তার জীবন কাহিনী নিয়ে লেখা। যদিও আমার নিজের অনেক চিন্তা-ভাবনা ঢুকে গেছে। তবুও লিখলাম। কারণ, তিনি গত হয়েছেন আমাদের মাঝ থেকে। ছোটবেলায় পরিবারের বাইরে তিনি খুব কাছের একজন মুরুব্বি যিনি আমাকে খুব ভালোবাসতেন। তাকে উৎসর্গ করেই লিখলাম লেখাটা।)
দেশভাগ হলো হিন্দু মুসলমানের ভিত্তিতে।
এই সুযোগে কেউ কেউ চেষ্টা চালায়,
উঠতে উচ্চ জাতিতে।
তাই হিন্দুর দেশে মুসলমানের,
আর মুসলমানের দেশে অমুসলমানের,
মারে বাটে আর ভাতে।
চারিদিকে দাঙ্গা-হাঙ্গামার খবর।
তার মাঝে দু'একটা বেশ জবর।
কেউ কেউ বলে এটা নয় তার।
আবার কেউ বলে এদেশ আমার।
মাঝে পড়ে হাহাকার।
নাই খাবার।
অন্নাভাবে দাঙ্গায় মরে মানুষ বাংলার।
আমার বাস ছিল তখনকার,
যুক্ত বাংলার কোন এক গ্রামে।
এখনো চোখে ভাসে।
এই তো সেদিন আমার পড়ার বন্ধু,
গণেশের কথকতা শেষে।
আনন্দে ভাসতাম সেইই বেশে।
বেশ যাচ্ছিল দিন।
হঠাৎই খবরে পাচ্ছিলাম,
সর্বত্র চলছে অবস্থা বেশ হীন।
আমাদের উপর তখনো,
পড়েনি তার বিন্দুমাত্র রেশ।
হঠাৎ করেই পাওয়া যাচ্ছিলো,
হিন্দুত্বের বড় তেজ।
কাছের বন্ধুরাও কথা বলছিলো না।
আমরা যে মানুষ এটা তারা মানছিলো না।
আমরা নাকি মুসলমান।
আমরা নাকি শুনি জিন্নাহ সাহেবের গান।
বলি, জন্মেছি হিন্দুস্থান।
পূর্বপূরুষের ভিটামাটি,
এটাই আমার দেশ,
আমার শেষ গান।
তবুও তারা করেই চলে অসম্মান।
মানুষ থেকে হয়ে গেলাম সংখ্যালঘুর জাত।
সংখ্যাগুরুর হাতে,
মার খেতে খেতে,
কুপোকাত।
সংখ্যাগরিষ্ঠ আর সংখ্যালঘিষ্ঠ।
কি সুন্দর তত্ত্ব!
মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি।
সুযোগসন্ধানীরা অন্যের সম্পদে,
ভাগ বসাতে করে হানাহানি।
আরো কিছুদিন গেলো।
হঠাৎ একদিন,
গ্রামের জব্বারের বাড়ির খড়ে,
জ্বলতে দেখি আলো।
এ তো নয় আলো;
কে বা কারা দিয়েছে আগুন;
পুড়ে হলো সব ছাই-কালো।
তারপরের দিন শুরু হলো,
গ্রামে হত্যাকাণ্ড, লুণ্ঠন।
চলল অবগুণ্ঠন।
আমি তখন নব-বিবাহিত।
জীবন চলছিল বাঁধাহীন অবারিত।
এর মাঝে জন্ম নিল এক ছেলে।
দাঙ্গায় ঘর-সম্পদ হলো ছাই, পুড়ে।
তাকে নিয়ে আশ্রয় নিলাম গোরস্থানে।
আশ্রিত হলাম নতুন কবরে এক।
গলিত লাশের মত নির্বাক।
হারিয়েছি বাক।
মাথার উপরে ডাকছে কুৎসিত সব কাঁক।
দিন হলো গোরের অবসর।
রাতটুকুই আহারের ভরসার।
বাচ্চাটা কাঁদলে মূখ চেপে ধরি।
এই বুঝি পশুর আধার হয়ে মরি।
গ্রাম দু'দিনে ফাঁকা!
মরা লাশগুলো বড়ই একা।
কেউ কেউ পুড়ে কয়লা-কাঠ।
পড়ে আছে সমস্ত;
তখন গ্রাম এক পোড়া মাঠ।
কারো কারো দেহ ছিন্নভিন্ন।
চোখের জলও তখন বন্য।
নিজ-পেট করে খাই খাই।
বাচ্চাটাও দুধের অভাবে মরণাপন্ন।
নিজেদেরই খাবার জোটে না তার আর অন্ন!
এর পর শুরু হলো নতুন যাত্রা।
জীবন গতিহীন,
তবুও পেলাম নতুন মাত্রা।
কষ্টে-সৃষ্টে ক্ষুধা পেটে,
হেঁটে পৌছালাম সীমান্তে।
ওপারে যেতে হবে দিনান্তে।
তারপর দিনটুকু কাটলো লুকিয়ে।
দিনকাটে না,
আকাশে-পানে থাকি তাকিয়ে।
সূর্য হাসে ঠোঁট বাঁকিয়ে।
অবশেষে স্ত্রী-পুত্র নিয়ে,
পাড়ি জমালাম যশোরে।
আশ্রিত হলাম যশোর জেলার,
অভয়নগর মুহাজির শিবিরে।
এখন মানুষ থেকে হলাম মুহাজির।
চলছিলো জীবন বড়ই ধীর।
এরপর কেটে গেলো অনেক বছর;
ওপারে সব হয়েছিল তছরূপ।
এপারে এসে হলাম রিফুজি;
দেখলাম এদেরও কতশত রূপ।
হিংস্রতায় যেন বাস্তবতা,
মানুষের বেঁচে থাকার বাহন।
হিংস্রতার মাঝেই পড়ে আছে,
কতশত হারোনোর বেদনা-গাঁথা।
ক্ষমতা আর স্বার্থের দ্বন্দ্বে,
জীবন হয় তছনছ,
ক্ষমতালিপ্সুরা মজা পায়,
পোড়া লাশের গন্ধে।
আম-জনতার চোখ অন্ধে,
নিজেরাই মরে, মারে পড়ে ফন্দে।
মানবতা ক্ষমতার কাছে নগণ্য,
ক্ষমতা পেলেই তারা হয় ধন্য।
ক্ষমতা পাওয়ার জন্য।
মানুষ হয়েও তারা যেন,
মারতে কসুর করে না মানুষ।
হায়রে, মানুষ।
দিনশেষে, মরবে তুমি হয়ে অমানুষ।
সময় থাকতে হও মানুষ।