দার্শনিকরা বলেছেন, Human life is not for own, Only others.
একটু যদি গভীরভাবে ভাবো তবে বুঝতে পারবে যে মানুষ যুথচারী জীব। তুমি কি একা কখনো বাঁচতে পারবে। পারবে না। একক মনের মানুষ সে তো নির্বাসনের সমান।
ধরো, তোমার পাশে কেউ নেই; তখন হয়তো তুমি দুঃখ পেলেও পেতে পারো। কিন্তু, আনন্দ। আনন্দ তুমি কিছুতেই পাবে না। আনন্দ পেতে গেলে পাশে আরেকটি মানুষের প্রয়োজন। সেই কারনেই তো বন্ধু-সান্নিধ্য আমাদের এত প্রয়োজন।
প্রশ্ন থাকতে পারে যে, দুঃখের সময়, বিপদের সময় আমরা মানুষকে কাছে পায় না কেন?
কে বলেছে পায় না! নিশ্চয়ই পায়। হ্যাঁ ঐ পাওয়ার সংখ্যাটাই হয়তো কম। সেই সংখ্যাটাই তো বাড়াতে হবে।
এই দুঃখের সময় মানুষের পাশে থাকা মানুষের সংখ্যাটা বাড়াতে হবে। আর সেটা বাড়াতে পারো কিন্তু তোমরা তরুন-যুবারা। তোমরাই বাড়াতে পারো।
দেখবে, দুঃখের সময় মানুষের পাশে দাড়াতে পারলে যে আনন্দ হয়, সুখের সময় কোন মানুষের পাশে দাড়ালে ঐ আগের আনন্দ কিন্তু তার অনেক অনেক বেশি। আর এই বোধটাই তো তোমাদের ভেতর সঞ্চারিত করতে চাইছি। এই বোধটা থাকলে নিজেদের ভেতরকার আমিটা ঠিকই এগিয়ে যাবে মানুষের কল্যানে এবং বিপদের সময়।
গত রাতে একটা সিনেমা দেখছিলাম। সে সিনেমার সংলাপে একজন আদর্শ শিক্ষক চরিত্র তিনি তার ছাত্রদের এগুলো বলছিলেন। তো এগুলো নিয়ে ভাবছিলাম। এমন সময় বয়ো-জ্যেষ্ঠ একজন মুরুব্বির সাথে দেখা হয়ে গেলো। মুরুব্বির সাথে প্রায়ই মাঝে-মধ্যে কথা হয়। দেখা যখন হয়ে গেল তখন আলাপচারিত জমতে আর কতক্ষন! শুরু হয়ে গেল-
→ শুনলাম তুমি নাকি লেখালেখিও করো?
: লেখালেখি করি এটা ঠিক কিনা জানি না! তবে, লেখালেখির চর্চা চালায় আর কি!
→ ভালো! তা বাবা এসব করে কি আর ভাত হবে?
: এটা আসলে আমার ভালো লাগে তাই করি! ভাতের ব্যবস্থার জন্য অন্য উপায় খুজছি।
→ তাইলে আর এসব করে লাভ কি! যাতে নাই ভাত, সে কাজে দিও না হাত!
: আপনি তো দেখছি কথার ছন্দ মিলাতে পারেন!
→ টুকটাক! যাইহোক, তোমার সাথে যারা পড়তো, তারা তো এখন ইনকাম করে। বিয়ে-শাদি করে সংসার চালাচ্ছে। বাচ্ছা-কাচ্ছার বাপ-মা হয়ে গেছে! তোমার খবর কি!
: চেষ্টা করতেছি মুরুব্বি! ধৈর্য্য ধরা ছাড়া উপায় নেই। সিস্টেম তো মানতে হবে!
→ কি যে জামানা আসলো! নিত্য নতুন সিস্টেমের কলে আমরা সবাই পিষ্ট হয়ে মরতেছি!
: দুঃখ করবেন না! দুনিয়াটা পরিবর্তনশীল।
→ নারে বাবা! তোমরা পড়ালেখা শিখেছো। চাকরি-বাকরি নাই দেশে। কি করবা!
: হতাশ হবেন না মুরুব্বি। চেষ্টা করলে সবই সম্ভব!
→ আর চেষ্টা! চেষ্টা করতে করতে কবে না জানি আমার মত বুড়ো হয়ে যাও!
: তাইলে আপনারে একটা গল্প বলি!
→ কি গল্প?
: গল্পটা আমার আব্বা আমার সাথে বলেছিলো-
দুই বন্ধু! একজন প্রফেসর। আর একজন অর্ধশিক্ষিত ভ্যান চালক! প্রফেসর বন্ধু একদিন ভ্যান চালক বন্ধুর ভ্যানে চড়ে বাড়ি যাচ্ছে।
তখন ভ্যান চালক বন্ধু প্রফেসর বন্ধুকে বলছে,
- দেখ্ দোস্ত, এক সাথে স্কুলে পড়তাম! তুই কোথায় আর আমরা কোথায়!
তখন প্রফেসর বন্ধু বলল,
- তোরা কখন বিয়ে করেছিস! আর আমি কখন। তোরা তো অনেক আগেই সংসারী হয়ে গেছিস, বাচ্চার বাবা হয়েছিস। আর আমি পড়ালেখার পিছনে খড়-কুটো জ্বালিয়েছিলাম তখন। যার ফল এখন ভোগ করতেছি।
তখন ভ্যান চালক বন্ধু বলল,
- তা ঠিক, আমরা আসলে নিজেদেরকে নিয়ন্ত্রনে রাখতে পারিনি। নিজেকে সংসারের মায়াজালে ফাঁসিয়ে দিয়েছিলাম। যার পরিনতি ভ্যান!
: কি বুঝলেন মুরুব্বি?
→ এই সব গল্প দিয়ে কি হবে! বাস্তবতা তো ভিন্ন!
: আসলে মুরুব্বি ভালো কিছু করতে হলে ধৈর্য্য ধরতে হবে। একবারে তো আর ছাদে উঠা যায় না। এটাই তো বাস্তবতা!
→ কিন্তু বাবা টাকা-পয়সা, লবিং ছাড়াও কি সম্ভব?
: এখনো যারা মনে করে, টাকা এবং লবিং ছাড়া চাকরি হয় না; উহারা অতি মাত্রায় মূর্খ এবং জ্ঞানপাপী। বর্তমানের নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পর্কে তারা সম্পূর্ণ অজ্ঞ বলে বোধ করি। সময় বদলেছে। যোগ্যতা এবং পরিশ্রম আপনার কাঙ্খিত চাকরির চেয়ারে পৌছে দিবে বলে দৃঢ় আস্থা এবং বিশ্বাস রাখি।
→ কি করো দেখা যাবে!
মানুষতো মানুষকে নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা করবে। এটা স্বাভাবিক। কারন, মানুষ সামাজিক জীব। যারা মানুষের কল্যানে কাজ করে, বিপদে ঝাপিয়ে পড়ে তাদের জন্য পুরস্কার-তিরস্কার দুটোই থাকবে। এটাও স্বাভাবিক। পক্ষ-বিপক্ষ থাকবে। আর ষড়যন্ত্রও। ভাবছিলাম!
এমন সময় আমার স্কুলের একজন শিক্ষক এসে বসলেন আমাদের আলোচনার মাঝপথে।
সালাম দিয়ে উঠে দাড়ালাম।
- উত্তর দিয়ে স্যার বললেন বসো। কেমন আছো?
: জ্বি স্যার, ভালো আছি।
আপনি কেমন আছেন, স্যার?
- তোমাদের দোয়ায় ভালো আছি!
তোমার পড়ালেখার কি খবর?
: পড়ালেখা শেষ স্যার! জবের জন্য ট্রাই করতেছি। আর জবের জন্য পড়তেছি।
- ওহ্, পড়ো! দেখো, ভালো কিছু করা যায় কিনা! দরকার হলে সময় নাও। তবুও, চেষ্টা করো ভালো কিছু করার জন্য।
: জ্বি স্যার, দোয়া করবেন।
- তোমাদের জন্য তো দোয়া সব সময় আছে, থাকবে। ওটা কি আর বলা লাগে। তোমরা আমার ছাত্র। তোমাদের জন্য তো দোয়া অবশ্যই থাকবে।
মুরুব্বি এতক্ষন তার কথা স্কিপ করে আমাদের কথা শুনছিলেন। হঠাৎ, স্যারের কথা কেড়ে নিয়ে বললেন,
→ স্যার দেশে তো চাকরি-বাকরি নেই। এদের কি হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে কি লাভ হলো!
- দেখুন, দেশে চাকরি নেই। এটা ভুল ধারনা। নিজেকে যোগ্য করে তুলতে পারলে অবশ্যই চাকরি পাবে। আপনাদের মত লোকেরা যুব সমাজকে হতাশায় নিমজ্জিত করতেছে। শিক্ষিত জাতি গঠনে আপনাদের মত অর্ধশিক্ষিত লোকেরা প্রতিবন্ধকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হচ্ছে।
→ কি বলেন স্যার!
- হ্যাঁ, এটাই সত্য। শুধু আপনি না। এরকম হাজারো অশিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত লোক আছে। যারা এই অপকর্ম করে যাচ্ছে। দয়া করে আপনারা এটা করবেন না।
→ স্যার আপনি একজন শিক্ষক হয়ে এমন কথা আমাকে বলতে পারেন না!
- কোনটা বলা উচিত আর না উচিত সেটা তো আমাকে আগেই ভাবতে হয়। কারন, আমি ছাত্রদের পড়ায়। তাদের মানসিক বিকাশটা আমাদের হাত দিয়ে গড়ে ওঠে। এদেশের পিতামাতারা অধিকাংশই অশিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত। তারা এসব বোঝে না। তাই পুরোটা শিক্ষকের উপর বর্তায়।
→ তারপরও মানুষকে এভাবে অশিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত বলে গালি দেয়াটা মাস্টার তোমার ঠিক না।
আমি এতক্ষন স্যারের সম্মান রক্ষার্থে নিজের কথাকে স্কিপ করে রেখেছিলাম। যদিও অনেক কথা বলতে পারতাম। তবুও বলিনি মুরুব্বিকে। অবশেষে, স্যারের অনুমতি নিয়ে মুরুব্বিকে বললাম-
: দেখুন মুরুব্বি এগুলো আসলে গালি না। এগুলো বাস্তবতা। আর আপনি এগুলোকে গালি বলেন কোন অর্থে!
→ তুমি বিশ্ববিদ্যালয় পড়েছো না?
: জ্বি হ্যা!
→ তাইলে, মুরুব্বিদের সাথে এভাবে বেয়াদবি করো ক্যান।
( মুরুব্বি যুক্তি-বুদ্ধি, জ্ঞানের কাছে হেরে কাউন্টার এটার্ক করতে শুরু করলেন) শেষে আমি বললাম-
: মুরুব্বি আপনার আরো বেশি চিন্তার চর্চা করা দরকার।
এই কথা শুনে স্যার মুচকি হাসি দিতে লাগলেন। আর মুরুব্বি লোকটা চা শেষ করে কিছু না বলে চলে গেল।
স্যার বললেন,
- তোমার মনে হয় সব মানুষের সাথে কথা বলার অভ্যাসটা যায়নি। অবশ্য, এটা মানবিক একটি ব্যাপার। কারন, তুমি তো আবার কারো কোন কথায় কষ্ট পাওনা। তুমি তো আমার সর্বংসহা ছাত্র ছিলে। সব মানুষ যদি এমন করে ভাবতো। দুনিয়াটা কত সুন্দরই না হতো।
স্যারের কথা শেষ হলে আমিও স্যারকে সালাম দিয়ে অনুমতি নিয়ে চলে আসলাম।