নতুন ভাবনাগুলো প্রজন্মে নয় প্রজন্মান্তরে গিয়ে কাজ করা শুরু করে। আজকে আপনি যে ভাবনাটাকে অসম্ভব বলে উড়িয়ে দিচ্ছেন। আগামীকাল সেটা কেউ না কেউ সম্ভব করে তুলছে। দু'জনের ভেতরে পার্থক্য একটাই। সেটা হচ্ছে, চিন্তা-ভাবনার।
শৈশব-কৈশোর কেঁটেছে গ্রামে। একটা সময় ভ্যান-রিক্সাওয়ালার প্যাডেল পাঁকানো দেখে খুব কষ্ট পেতাম। প্যাডেল পাঁকাতে পাঁকাতে অঝোর-ধারায় শরীর দিয়ে ঘাম ঝরতো। খুবই কষ্ট পেতাম দেখে।
তখন ভাবতাম যদি এটাতে মেশিন ফিট করা যেতো। এক সময় সেটা হলো! পরে ইঞ্জিন-ভ্যানে চড়তে ভয় লাগে। কারণ, খুবই ঝাঁকি মারে। তখন ভাবতাম যদি মটর ফিট করা যেতো। সেটাও হলো। তারপর ভাবতাম যদি ছাউনি দিয়ে গদিওয়ালা কোন ছোট মোটরচালিত গাড়ি হতো। এখন সেটাও বাস্তব। পরিবেশ-বান্ধব ইজিবাইক। ভ্যান-রিক্সাও এখন আর পায়ে পাঁকানো লাগে না। এগুলোতো স্বল্প পরিসরের, বিস্তৃতভাবে দেখলে অনেক পরিবর্তন আপনার চোখে ধরা দেবে খুব সহজেই।
সময়ের সাথে সব কিছুতে পরিবর্তন সূচিত হয়। নিজেকে এবং নিজের পারিপার্শ্বিকতাকে পরিবর্তিতরূপের সাথে খাপ খাওয়ানোর জন্য মানব-সৃষ্ট কতিপয় বিষয়কে পরিবর্তন করতে হয়। তা না হলে, এডজাস্টমেন্ট প্রব্লেম দেখা দেয়। যেটা সমস্যাকে আরো বেশি প্রকট করে দেয়। জটিল করে দেয়। বিষয়টা ব্যষ্টিক-সামষ্টিক দু'অর্থেই।
আজকে তেমনি একটি বিষয় নিয়ে আমরা আলোচনা করবো। শুরু করা যাক,
→ আচ্ছা ভাই, মৃত্যুদণ্ড কি অপরাধ কমায়? নাকি একটা সময় পর অপরাধীর অপরাধ প্রবনতাকে উৎসাহিত করে?
: দেখো, মৃত্যুদণ্ডও আমার কাছে একটি হত্যাকাণ্ড মনে হয়। সিস্টেমেটিক হত্যাকাণ্ড! একজন ব্যক্তি অন্যকে হত্যা করলো তার শাস্তিস্বরূপ আরেকটি হত্যাকাণ্ড ঘটানো! এটা নিঃসন্দেহে বর্বরতা মনে হয় আমার কাছে! রাষ্ট্র কখনো একজন খুনিকে অনুসরণ করতে পারে না।
এটা প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় কালচার! বর্তমান আধুনিক যুগে এটার অপ্রাসঙ্গিকতা প্রকাশ পাচ্ছে।
→ কিভাবে বুঝলেন? এটাও তো হতে পারে যে ওটার প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে!
: দেখো, সময় কিন্তু প্রবহমান। সে থেমে থাকার নয়। চলমান। পৃথিবীতে দুটো মহাসত্য আছে। এক. পরিবর্তন। দুই. ধ্বংস। যাকে আমরা মৃত্যুও বলি। এখানে একটা মজার বিষয় ঘটে! সেটা হচ্ছে, পরিবর্তনের হাত ধরে সব কিছু ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌছে যায়। বিষয়টা ইন্টারেস্টিং না?
→ তা বঁটে! তবে, প্রাসঙ্গিকতার হ্যাঁ, না ব্যাখ্যা করেন!
: ওহ্ হ্যাঁ বলছি, আমরা তো দেখছি, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি অল্প সময়ে অনেকদূর এগিয়ে গেছে। আগে যেখানে সামাজিক, রাজনৈতিক থেকে শুরু করে সবখানে ধর্মই সর্বেসর্বা ছিল। এখন তার সবকিছু বিজ্ঞান-প্রযুক্তি নিয়ে নিচ্ছে।
→ তা কিভাবে হয়? এখনো তো সব যায়গায় ধর্মের ব্যাপক একটা প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে!
: হ্যাঁ বলছি, আমাকে শেষ করতে দাও!
কোথায় যেন থামছিলাম?
ওহ্, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ও ধর্ম নিয়ে কথা হচ্ছিলো। যাইহোক, আগেই বলে রাখি ধর্ম যতটা না ধর্মীয় তার থেকে বেশি রাজনৈতিক। আর গণ-সাধারন ধর্মের নামে যেটা করে সেটা যতটা না ধর্মীয় তার থেকে বেশি সামাজিক।
এটা বোঝার জন্য ধর্মগুলো সম্পর্কে একটু অধ্যায়ন আর আশেপাশে নজর দিলেই বুঝতে পারবে। খুব বেশি ব্যাখ্যা করা লাগবে বলে মনে হয় না।
→ তা তো বুঝলাম! কিন্তু, শাস্তির প্রাসঙ্গিকতা কোথায় নেই বলেন!
: একটা সময় ছিল যখন মানুষ ধর্ম দিয়ে সব কিছু দেখার চেষ্টা করত। আর এখন সব কিছু দেখে গুগল করে। এটা বৈপ্লবিক পরিবর্তন বঁটে।
→ হুম!
: এবার দেখো যে, তুমি যে শাস্তির কথা বলছো তা অনেক পুরানো প্রথা।
→ হুম! একদম ঠিক!
: তাহলে আমরা একটু হিসাব করলে বুঝতে পারব যে কেনো এটা অপ্রাসঙ্গিক। এখান থেকে ১০০০ বছর আগে মানুষ চলাচল করত ঘোড়া, গরু ইত্যাদি বাহনে চড়ে। আর এখন গতিময় জীবন। এই পরিবর্তনকে অস্বীকার করার উপায় নেই! বস্তজগতের এত পরিবর্তন হচ্ছে মানে মানুষের জীবনযাত্রায়ও মহা পরিবর্তন হচ্ছে। সে হিসাবে পুরাতন কোন প্রথায় আটকে থাকা মহা-বোকামী বৈ-কিছু না।
বোঝা গেল।
→ তা তো বুঝলাম। কিন্তু, ধর্মের প্রভাবে তো সব কিছুতে এখনো পুরাতন প্রথা বহমান রয়েছে।
: দেখো, তুমি যদি সামষ্টিক চিন্তা-ভাবনা না করে গোষ্ঠীবদ্ধ চিন্তা-ভাবনা করো তাহলে আলোচনা করে লাভ হবে না।
→ ওকে আপনি এগিয়ে যান!
তবে, আমার কাছে মনে হয় অপরাধীর অবশ্যই শাস্তি পাওয়া উচিৎ। কেননা, কুসংস্কার এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি।
: আমিও অপরাধী শাস্তি পাবে এটা চাই। তবে, সেটা মৃত্যুদণ্ডের মত জঘন্য হত্যাকাণ্ড নয়।
তবে সবচেয়ে ভালো হয়, তাকে অপরাধ-প্রবনতা থেকে বের করে আনা। কাউন্সেলিং করানো, সৎ-কর্মের ট্রেনিং দেয়া। জীবিকার তাগিদে কর্মোপোযোগী চিন্তা-চেতনা তার মধ্যে প্রবেশ করানো। একজন অপরাধীর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সহানুভূতি, সু-আচারণ। যেটা দেখে সে সৎকর্মে উৎসাহিত হতে পারে।
আর একটা কথা, আমরা আইনগুলোতে নতুনত্ব আনতে পারিনি। পুরাতন আইন দিয়ে সবকিছু বিবেচনায় নিচ্ছি। যে কারনে সমস্যা আরো প্রকট হচ্ছে।
→ এটার অনেক ঝামেলা আছে। আপনি যখনই এটার বাস্তবায়ন করতে যাবেন তখনই কিছু মানুষ এটার বিরোধিতা করবে।
: যে যেটা বোঝে না তার কথা শুনে সেটা করতে যাওয়া বোকামী। বিপদে পড়তে হয়। সময়কে সাথে নিয়ে চলতে হয়। সময়ের চোখে সবকিছু দেখতে হয়।
অনেকে আছে নামাজ পড়ে না, রোজা রাখে না অথচ ধর্ম নিয়ে প্রচুর সরব। অনেক সময় দাঙ্গা-হাঙ্গামা বাধিয়ে দেয় এরা।
দেখবা, মূর্খরা ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করে। জিহাদের নামে ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম চালায়। এটা বাস্তবতা! চারপাশে খেয়াল করলে খুজে পাবে। জিহাদ আর যুদ্ধকে অনেকে একাকার করে ফেলে।
→ মাঝে একটা কথা একটু বলি?
: ওকে, বলো!
→ আমি খেয়াল করে দেখেছি যে সাধারন মানুষ শিক্ষিত মানুষদের খারাপ বলে এই-সেই আরো কত কি। এটার কারন কি মনে হয় আপনার?
: প্রসঙ্গ এড়িয়ে চলে যাচ্ছ কিন্তু!
→ আমরা আবারও ওখানে ফিরে যাব। সমস্যা নাই। তবে, গত কয়েকদিন ধরে এই বিষয়টা নিয়ে ভাবছিলাম। কোন কূল-কিনারা খুজে পাচ্ছিলাম না। এ বিষয়ে কিছু বলেন!
: ওকে! এমনিতে "পৃথিবীতে কেউ কারো মত নয়। সবাই যার যার মত।" তার উপর শিক্ষা-অশিক্ষার ব্যাপার। এখানে অবশ্যই পার্থক্য হবে। আসলে, যারা শিক্ষিত তারা যেটা চর্চা করে, মূর্খরা তা করে না। সংস্কৃতি চর্চার একটা বিরাট দেয়াল রয়ে যায় দু'জনের মধ্যে। এজন্য দু'জনের মতের অমিল হওয়াটা তো স্বাভাবিক।
একজন জ্ঞানী লোক সে কখনো মানুষকে দোষারোপ করে না। সমস্যার সমাধান করে। মূর্খরা একে-অন্যের দোষারোপ করে সময় নষ্ট করে।
আসল প্রসঙ্গে ফিরে যায়! কোথায় যেন ছিলাম আমরা?
→ যাহোক, ধর্ম বাদ দিয়ে আসলে এ আলোচনা করাটা মুশকিল। তারপরও উপায় নেই। কারন, মধ্যযুগ তো পুরোটাই ধর্মের প্রভাবে চলে এসেছে। এখনো অনেক ক্ষেত্রে যদিও ধর্ম একটি স্পর্শকাতর বিষয় হয়ে রয়েছে। তাই এটাকে একটু সরিয়ে আমরা আলোচনাটা চালালে কেমন হয়।
: তা ঠিক বলেছো! সমাজে প্রচুর লোক রয়েছে, যারা বাস্তবতার চেয়ে অনুভূতি দিয়ে সব কিছু বিবেচনায় নেয়। যে কারণে সমস্যার সমাধান করাটা মুশকিল হয়ে যায়। সমস্যা তো একটি বাস্তবতা। তাকে অনুভূতির নিরিখে দেখাটা কিছুটা হলেও বোকামী বৈ-কি!
তবে, তাইহোক! যেহেতু, এখন সবকিছুতে ধর্মকেন্দ্রীকতা কমে গেছে। মিশ্র-রাষ্ট্রব্যবস্থায় সব কিছু চলছে সেহেতু আলোচনাটা রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে দেখা যায়। তাই করি!
→ একমত! তাই করা যাক! রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ড বলে ইদানিং একটি কথা বলা হচ্ছে বিভিন্ন মাধ্যমে।
: উঠাটা স্বাভাবিক! কেনো উঠবে না? বলো আমাকে! আমি তো বলেছি সময় তার আপন গতিতে চলে, থেমে থাকার পাত্র সে নয়। আজকে তুমি যেটা হবে না, পারবো না বলে ফেলে রাখছো, আগামীকাল সেটা কেউ না কেউ করে ফেলছে।
→ তাহলে কি এটা ঘটে বা ঘটছে?
: অবশ্যই! তবে, কিছু মানুষ ঢালাওভাবে বলা শুরু করেছে। আসলে সেটা ভুয়া। কোন সত্যতা খুজে পাওয়া যায় না সেগুলোর।
ফায়দা লুটার ধান্ধাবাজি। অবশ্য, রাষ্ট্রও চেষ্টা করছে এ ধরনের ধান্ধাবাজদের দমন করতে। কিন্তু, সবচেয়ে ভালো হতো আমরা যদি সবকিছুতে হুজুগে মাতাল না হয়ে, যাচাই-বাছাই করে ভালো-মন্দ বিবেচনা করে দেখতাম এবং বলতাম।
→ ভাই আপনাকে ধন্যবাদ!
: আপনাকেও ধন্যবাদ।
→ অনেক আলাপচারিতা হলো আজকে। অন্য কোনদিন অন্যকোন বিষয় নিয়ে আলোচনা জমবে।
: ইনশাল্লাহ।