কবিতা লিখতে ভালো লাগে! তবে, গল্প লিখতেও তো মানা নেই! যদি সেটা জীবনকে ছুয়ে যায়! জীবনকে তো শুধু কবিতার অন্দরে আটকে রাখা ঠিক হবে না! জীবনের পরতে পরতে মিশে আছে গল্প! তাই গল্পের বন্দরেও ভিড়াতে হয় তরী। সব সময় হয় না! তবে, উত্তাল সমুদ্রে তরীখানি মাঝে-মধ্যে এ বন্দরে ফিরে আসে নতুন নতুন বাস্তবতা নিয়ে! আজকে তেমনি এক বাস্তবতার গল্প বলি!
চা-বিড়ির আড্ডায় প্রায়ই ছোট বড় সবাই আমি, আমরা মিলিত হই। তবে, সেদিন আমার খুব কাছের, খুব প্রিয়, ভালোবাসার ছোট-ভাই আর আমি ছাড়া কেউ উপস্থিত ছিল না। অগত্যা দু'জনের কথা চালাচালিতে এগুলো বেরিয়ে আসে--
→ ভাই আপনি তো বেকার মানুষ। পকেটে টাকা থাকে না। তবুও, আপনার মধ্যে এত রসবোধ, উদ্যম কোথা থেকে আসে? ভাই, দয়া করে একটু বলেন না ভাই! প্লিজ!
: বেকারত্ব তো সেদিনের ঘটনা! খালি পকেটে ঘুরে বেড়ানো রপ্ত করেছিলাম অনেক আগেই। পুরানো অভ্যাস! আর সবচেয়ে বড় কথা, আমি ও সব দুঃখের ধার ধারি না।
→ এত পড়ালেখা শিখলেন। চাকরি-বাকরি কিছু করবেন না? ভাই!
: আরে ব্যাটা শোন্, পড়ালেখা হচ্ছে মানুষের মৌলিক অধিকার। অনেকে দেখ্ নিজের মৌলিক অধিকারটা পূরণ করতে পারে না। আমি হয়তোবা পেরেছি।
চাকরি নিয়ে ভাবি না। ওটা জীবিকার মাধ্যম। কোন একভাবে চলে যাবে।
শুধু বই পড়তে পারলে আমি বেশি খুশি। আর পড়ালেখা মানে তো শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকে বোঝায় না। এটা নিয়ে তো তোর সাথে বিস্তর আলোচনা করেছিলাম। মনে নেই!
→ উমমম! ওহ্ হ্যাঁ! যেদিন রিক্সায় করে আপনার সাথে বেড়াতে গেছিলাম ঐ দিনের কথা।
: হুম, স্বশিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারাটাই আসল শিক্ষা। তার জন্য বই কিনে পড়তে হবে। বই কেনার অভ্যাসটা রপ্ত করতে হবে। এটা শ্রেষ্ঠগুণ। আর এ শিক্ষার গুরুত্বও অনেক বেশি। এটার উপকারিতার ক্ষেত্রটাও অনেক বিশাল।
পড়ালেখাকে আমরা শুধু চাকরির মধ্যে আটকে রেখেছি, চিরাচরিত ধ্যান-ধরণার নিগড়ে। মুক্তি দিতে হবে। তবেই, শিক্ষার আসল স্বাদ পাবে জাতি। পড়ালেখাকে চাকরির বাহন মনে করা ছাড়তে হবে।
সার্টিফিকেট সর্বস্ব প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা দিয়ে জাতির সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। শিক্ষার সর্বজনীন উপকারিতার জন্য স্বশিক্ষার প্রতি গুরুত্বারোপ করতে হবে।
: তোরে একটা গোপন বাণী দিই শোন্।
→ কি ভাই?
: ওয়ারেন বাফেটে্র নাম শুনেছিস?
→ হ্যাঁ ভাই, বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ের মালিক। আমেরিকার একজন শ্রেষ্ঠ ধনী, জ্ঞানী ও বিনিয়োগকারী।
: বাহ্, চমৎকার! অনেক কিছুই তো জানিস!
→ সবই আপনার দোয়া ভাই!
: থাক, আর ফর্মালিটিস দেখাতে হবে না।
শোন্, তিনি তার কোন এক লেখা বা বক্তব্যে বলেছিলেন,
"The more you learn, The more you earn. The more you read, The more you learn."
→ কিন্তু ভাই, মানুষ তো আর তা বোঝে না! এমনকি বোঝালেও বোঝে না! তারা টাকাকেই বেশি প্রাধান্য দেয়!
: আরে এটা স্বাভাবিক। তারা তো এটা বুঝবে না। তারা নিজেদের ভেতর বোঝার মত বোধ তৈরি করতে পারেনি, তাই তারা বোঝে না! মূর্খের সমাজে বই ও জ্ঞানের মূল্য নেই। আছে টাকার।
তাই মূর্খদের পরামর্শসূলভ কথা শোনা পাপ! বিপথগামী, দিশেহারা হয়ে যেতে হয়, তাদের মূর্খতার চক্রে পড়ে। কোন একদিন যদি পড়িস, তখন বুঝবি।
→ একই কাপড় পরে দীর্ঘদিন কাটিয়ে দেন। লোকে তো আপনারে নিয়ে অনেক কিছুই বলে! ভাই!
: কি বলে একটু শুনি। বল্ তো!
→ এই যেমন ধরেন, পাগল টাইপ কিছু!
: শোন্, আমি কাপড়-চোপড় নিয়ে ভাবি না। বই পড়তে ভালোবাসি; বই কিনি আর পড়ি। এমনও হয়েছে কাপড় কিনতে টাকা দিছে আব্বা, সে টাকা দিয়ে বই কিনে এনেছি। জন্মের অভ্যাস; মনে হয় ছাড়তে পারব না।
→ সেটা তো ঠিক আছে। কিন্তু, মানুষ তো উল্টাপাল্টা কথাবার্তা বলে। তার কি হবে?
: কে কি বললো তাতে কি যায় আসে। মূর্খরা অন্যেরে নিয়ে সমালোচনা করে নিজের সময় নষ্ট করে।
আমি সে সময় বই পড়ে, গান শুনে, সিনেমা দেখে কাটায় না হয় ঘুরে বেড়ায়; তাও যদি ভালো না লাগে, তবে জম্পেশ ঘুম দিয়ে দিন পার করি।
আমি কোন মানুষের মূখাপেক্ষী হতে চাই না। নিজের মত করে চলতে চাই। নিজের বিদ্যা-বুদ্ধি খাটিয়ে যেটা ভালো মনে হয়, সেটা করি; খারাপ লাগলে সেটা করি না।
→ যারা পাগল বলে তাদের কি বলবেন?
: নিজের শিক্ষক পর্যন্ত পাগল বলতে দ্বিধাবোধ করেনি। আর আম-জনতা তো চিন্তা না করেই কথা বলে।
আর পাগল উপাধীটা স্কুল লাইফ থেকে চলমান। কে যে কখন দেয় বুঝি না। কেউ সামনে বলে আবার কেউ পিছে বলে। তাই, ওটার প্রতি কোন আগ্রহই জন্মায়নি।
এমনও হয়েছে বই কিনি বলে, অনেকে বলেছে ফাও বই কিনে টাকা নষ্ট করি। আমি নাকি বোকা! তাইলে আর হয়! আমি তো এখনো দেউলিয়া হয়নি। দেখছিস্ তো!
→ তারপরও ভাই!
: তারপর There is no genious free from tencture of madness. অর্থাৎ, কোন প্রতিভাবানই পাগলামির টান থেকে মুক্ত নয়।
আর তুই যাদের কথা বলছিস, তারা গণ-সাধারন। গণ অর্থে আমরা যদের বুঝি তারা কখনো তলিয়ে ভাবে না। চিন্তার চর্চা করে না। তারা সব সময় অসচেতন কথাবার্তা বলে।
তাদের চিন্তাভাবনাহীন কথাবার্তা শুনে সিদ্ধান্ত নেয়া মানে সর্বনাশের মাথায় বাড়ি!
→ তারপরও ভাই আমার খারাপ লাগে! আপনি পরিবর্তনের কথা বলেন। নিজেরে একটু পরিবর্তন করেন, ভাই। আর ভালো লাগে না আপনাকে নিয়ে এসব শুনতে! প্লিজ ভাই!
: আমি যদি বদলে যায়, আমাকে তুই আর এখানে কখনো হয়তোবা পাবি না।
তবে, বই পড়তে কখনো নিষেধ করিস না। তোর প্রতি সব ভালোবাসা উবে যাবে তখন।
আর আমি মানুষের চিন্তা-চেতনার ইতিবাচক পরিবর্তনের কথা বলি। পোশাকের না!
নিত্য নতুন পোশাক পরার মধ্যে কোন কৃতিত্ব নেই। যদি নিজের ভেতর কিছু না থাকে। সেটা মাঁকাল ফল সদৃশ হয়ে যায়।
সৌন্দর্য দেখে মানুষ ভালোবেসে হাতে তুলে নেয়; ফাঁটিয়ে ছুড়ে ফেলে দেয়! ধারণ করে না! মাঁকাল ফল চিনিস তো?
→ হুম ভাই, আপনি অনেক বইপত্র পড়েন। আপনার সাথে এঁটে উঠাটা মুশকিল।
: তুইও তো পড়িস। আমার কত বই তো মেরে দিলি।
→ ভাই, লজ্জা দিয়েন না।
আপনার বই মানে অামার বই; আর আমার বই মানে বাপের টাকায় কেনা।
: মশকারি করিস ক্যা!
→ সর্যি ভাই।
: ঠিক আছে।
তবে দেখিস, সময়ের প্রবহমানতায় একদিন সবই বদলে যাবে। তবে, মনে হয় আমার জন্মের অভ্যাসটা বদলাবে না।
→ কি সেটা ভাই?
: একটু আগেই তো বললাম!
→ ওহ্ বুঝেছি!
ভাই, দোয়া করবেন! এখন রুমে যাব!
: যা! তবে ভালো করে পড়িস। পাশাপাশি বইও কিনিস। আমারে এবার একটু মুক্তি দে।
→ ভাই!
: যা!