সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

মুক্তচিন্তা এবং মুক্তমনা বলতে কি বোঝায়?


অনেকে মনে করে মুক্তচিন্তা বা মুক্তমনা বলতে, 'মন যা চাই তাই করা'। আসলে, এটা কি সঠিক? আমার তো মনে হয়, তাদের জানার পরিধি অনেক ছোট হয়ে সংকুচিত হয়ে গেছে। তানাহলে, না-জেনে, না-বুঝে কোন বিষয়ে এমন মন্তব্য করাটা অসমীচীন বঁটে!


মুক্তচিন্তার ধারণাটা মূলত একটি আধুনিক চিন্তা-ভাবনা। তবে, প্রযুক্তির প্রসারে ইন্টারনেট আর সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যানে মুক্তচিন্তা তার সময়ের আগেই অনেক প্রসার লাভ করেছে।


মুক্তচিন্তার প্রথম সোপান হচ্ছে, নিজের মত করে জ্ঞানের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে একটি বিষয়ে যুক্তিসঙ্গত উপায়ে মানবিক দৃষ্টিকোন বজায় রেখে নিজস্ব মতামত উপস্থাপন করা। মুক্তচিন্তায় এবং মুক্তমনারা বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে সবকিছু দেখে। যারা মুক্তচিন্তা করে তারাই মুক্তমনা বলে পরিচিত।

[মুক্তচিন্তা হল এক প্রকার দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গী যা বলে যে বিজ্ঞান, যুক্তিবিদ্যা এবং যুক্তির আলোকে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত; মতামত গঠণের ক্ষেত্রে প্রথা, অন্ধ বিশ্বাস এবং কর্তৃপক্ষ দ্বারা প্রভাবিত হওয়া বাঞ্চনীয় নয়। সচেতনভাবে মুক্তচিন্তার প্রয়োগকে বলে মুক্তচিন্তন এবং এর অনুশীলনকারীদের বলে মুক্তমনা।


ঊনবিংশ শতাব্দীর ব্রিটিশ গণিতজ্ঞ এবং দার্শনিক উইলিয়াম কিংডন ক্লিফোর্ডের “ক্লিফোর্ডস্ ক্রেডো” এর একটি বাক্যকে মুক্তচিন্তার ভিত্তি বলা যায়- “যে কোন ব্যক্তির যে কোন জায়গায় উপযুক্ত প্রমাণের অভাবে কোন কিছু বিশ্বাস করা উচিত নয়”।


মুক্তচিন্তা বলে যে জ্ঞান ও যুক্তির অনুপস্থিতিতে দাবিকৃত কোন মতকেই সত্য হিসেবে গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করা উচিত না। সুতরাং, মুক্তমনারা বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান, বাস্তব সত্য এবং যুক্তির আলোকে মত গড়ে তুলে এবং হেত্বাভাস অথবা কর্তৃপক্ষ, পক্ষপাতদুষ্টতা, লোকজ্ঞান, জনপ্রিয় সংস্কৃতি, কুসংস্কার, সাম্প্রদায়িকতা, প্রথা, গুজব এবং অন্য সব গোঁড়া, বৌদ্ধিক প্রতিবন্ধকতার উৎসাহদাতার ভূমিকা পালনকারী শাস্ত্র থেকে নিজেদের বিরত রাখে। ধর্মের ক্ষেত্রে মুক্তমনারা সাধারণত বলে যে অলৌকিক অবভাসের পক্ষে প্রমাণ যথেষ্ট নয়।


১৬৯৭ সালে জন লককে লেখা উইলিয়াম মলিনিউক্সের চিঠি এবং ১৭১৩ সালে এন্থনি কলিন্সের “ডিসকোর্স অব ফ্রি-থিংকিং” এ এরুপ ধ্যান-ধারণা প্রথম প্রকাশ পেয়েছিল।]-(উইকিপিডিয়া)


বর্তমান সময়ে ইউরোপ-আমেরিকার উন্নত দেশগুলো মুক্তচিন্তার বিকাশ ঘটিয়ে উন্নত হয়েছে। নতুন নতুন আবিষ্কার মুক্তচিন্তার ফসল। ধর্মীয় গোড়ামী যেখানে আটকে রাখে, সেখানে মুক্তচিন্তা নতুনত্বের আহ্বানে সাড়া দিয়ে উন্নত জীবন-বোধের দিশা দেয়।


ধর্মের অতিরিক্ত বিধি-নিষেধের বেড়াজাল, কুসংস্কার মুক্তচিন্তার পরিপন্থী হওয়ায় ধর্মের মধ্য থেকে নতুনত্ব পাওয়া মুশকিল। মুক্তচিন্তা যেখানে নতুনত্বকে, গঠনমূলক সমালোচনাকে উদার মানসে আহ্বান জানায়; সেখানে ধর্মে নতুনত্ব পড়ে থাক, সমালোচনা করায় মহাপাপ বলে গন্য।


একটা বিষয় খুবই অবাক লাগে, মুক্তচিন্তার ফসলগুলো ধর্ম কিভাবে মিথ্যাচারের মাধ্যমে আত্মীকরণ করে; সেটা দেখে। যারা ধর্মের বাইরে গিয়ে মুক্তচিন্তনের মাধ্যমে নতুন কিছু আবিষ্কার করে; তাদের উপর নানাভাবে অত্যাচারের কাহিনী আমরা ইতিহাস থেকে জানতে পারি। ব্যক্তির মৃত্যুর পর অত্যাচারের ঘটনা চাপা দিয়ে ফসল ঘরে তুলে নেয় ধর্মীয় গোষ্ঠী।


ধর্মের মধ্যে কুসংস্কার থাকতে পারে, এটা মৌলবাদী গোষ্ঠী বিশ্বাসই করে না। আর যদি কোন কুসংস্কার থাকে, তবে সেটা ধর্মের অলঙ্ঘনীয়, পালনীয় আচরণ বলে তারা মনে করে। মানে, তারা এটাকে কুসংস্কার মানতে নারাজ।


ধর্মের মধ্যে অমানবিক কিছু থাকলেও ধর্মীয় গোষ্ঠি সেটাকে ধর্মের অলঙ্ঘনীয়, পালনীয় কর্ম বলে স্বীকৃতি দেয়। আর একটা বিষয়, সময়ের সাথে অনেক বিষয় পরিবর্তনের তাগিদ তৈরি হয়। ধর্মীয় মৌলবাদী প্রাচীন-পন্থীরা এটাকে মহাপাপ বলে ফতোয়া দেয়।


যে যতই লাফালাফি করুক! লাভ নাই! পরিবর্তনকে অস্বীকার করার জোঁ নেই। আর মুক্তচিন্তাও এই পরিবর্তনের উন্নত ফসল। মুক্তচিন্তা পরিবর্তনকে ভিত্তি ধরে এগিয়ে যাচ্ছে বলে এটাকে নিঃশেষে অবিভাজ্য ধরা হয়। আর ধর্ম পরিবর্তনকে অস্বীকার করে এগিয়ে যেতে চায় (যদিও অসম্ভব) বলে উপযোগিতা হারাচ্ছে দিন দিন।


ধর্মকে আকড়ে যদি পড়ে থাকেন তবে নিজেকে আস্তাকূড়ে নিক্ষেপ করবেন। আমি বলছি না, ধর্মের সব খারাপ। তবে কথায় আছে, কুসংস্কার আর গোড়ামীর পঁচা পানির বন্যায় সে ভালোগুলো নষ্ট-প্রাপ্ত।


মুক্তচিন্তার সাথে ধর্মকে টেনে আনার কারন, মুক্তচিন্তার বিকাশে সবচেয়ে বড় বাঁধা ধর্মীয় কুসংস্কার, মৌলবাদ আর গোড়ামী।
আসুন, আমরা কুসংস্কার, মৌলবাদ আর গোড়ামীমুক্ত মুক্তচিন্তার মাধ্যমে আধুনিক, উন্নত, কল্যানমূখী সমাজ ও জীবন ব্যবস্থা গড়ে তুলি।