একজন মা যেমন নারী; একজন স্ত্রীও তেমন নারী; একজন বোনও তেমন নারী; অন্যের মা-স্ত্রী-কন্যাও তেমন নারী। এরা সবাই নারী। ভিন্নতা খালি সমাজের চোখে আর সামাজিকতায়।
নিজের মা-বোন-কন্যাকে নিয়ে কেউ কটুক্তি করলে বা উত্যক্ত করলে কেমন লাগে! ঠিক তেমনি অন্যেরও খারাপ লাগে। তাছাড়া, যার সাথে এ ধরনের আচরণ করা হচ্ছে তারও কেমন খারাপ লাগে একবার ভেবে দেখুন! তার মানসিক পরিস্থিতি কেমন হতে পারে ভেবে দেখুন তো! আর যদি নারী শিক্ষিত হয় তাহলে হয়তো সে ইজ্জতের দায় কিছু বলছে না বা সামাজিক প্রেক্ষাপটে প্রতিকারহীন হালকা প্রতিবাদ করছে। কিন্তু, আপনার নেতিবাচক নোংরা ব্যক্তিত্ব ও চরিত্রের চাক্ষুস স্বাক্ষী হয়ে যাচ্ছে। আমরা নিজের মা-বোন-কন্যাকে কেউ কিছু বললে রেগে যায়। আর অন্যের মা-বোন-কন্যাকে নিয়ে কটুক্তি বা উত্যক্ত করতে কম যায় না!
ধর্ষন একটি সামাজিক ব্যাধি। এটি সাধারনত পুরুষের দ্বারাই সংঘটিত হয়। কিন্তু, আমাদের সমাজ ও সমাজের মানুষ যে নারী এটা দ্বারা আক্রান্ত হয় তার উপর দোষ চাপিয়ে দেয়। নারীর চলাফেরা, পোষাক-পরিচ্ছদের দোষ হয়ে যায় তখন। এটা ধর্ষনকামী পুরুষতান্ত্রিক সমাজ সদাশয় প্রচার করে বেড়ায়। যেখানে বোরকা পরা মা-বোন-কন্যারা ধর্ষনের হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছে না। এমনকি দুধের শিশু পর্যন্ত ধর্ষিত হচ্ছে। সেখানে নারীর চলাফেরা, পোষাক-পরিচ্ছদ কিভাবে ধর্ষনের কারন হয়; তা আমার বুঝে আসে না! এটা কোন ধরনের মানসিকতা ভাই!
আর নারী শিক্ষার ব্যাপারে, সমাজে অনেক নেতিবাচক কথা প্রচলিত রয়েছে। তার মধ্যে, মেয়েদের বেশি পড়ালেখা শেখার দরকার নেই। কারন, বিয়ে দিলে শ্বশুর বাড়ি যাবে সেখানে গিয়ে রান্না করতে হবে। তাই রান্না শিখলে চলবে বা পারিবারিক কাজে দক্ষ হলেই হলো। শফি হজুর তো ঘোষনা দিলো, মেয়েদের ৪র্থ শ্রেণীর বেশি পড়ালেখার দরকার নেই। এমনকি তিনি নারীদেরকে তেঁতুলের সাথে তুলনা করেছেন এভাবে, নারী দেখলে তেঁতুলের ন্যায় জিহ্বায় পানি আসে। তিনিও তো কোন মায়ের সন্তান, তারও তো কন্যা সন্তান থাকতে পারে! যতসব আবালীপনা!
বাল্যবিয়েও একটি সামাজিক ব্যাধি। এটা নারীকে অধিকারহীন করে। বাল্যবিয়ের ফলে নারীর জীবনে নেমে আসে ঘোর-অন্ধকার। দেখা যায় মেয়ের মা একজন নারী হওয়ার পরও নিজের মেয়েকে অন্যের ঘরে বাল্যবিয়ে দিয়ে অধিকারহীন করতেও কসূর করে না। বাল্যবিয়ের মত একটি স্লো-পয়জনের কবলে ফেলতে বুক কাপে না। পরিবারের অন্য মহিলারাও এটার প্রতিবাদ করে না; সহযোগির ভূমিকা পালন করে। বিষয়টা আমার কাছে আজব লাগে! বাল্যবিয়ে সম্পর্কে আমার গবেষণামূলক এ লেখাটি পড়লে বুঝতে পারবেন। নিচে লিংক-http://bishleshon.blogspot.com/2017/05/blog-post.html
আমাদের সমাজে নারী নির্যাতিত হয়ে থাকে বেশিরভাগটাই পরিবারে। বাকিটা সমাজ ব্যবস্থার দ্বারা। শারীরিক-মানসিক উভয়ভাবে। ন্যাংটা সমাজ থেকে এর বেশি কিছু আশা করাও ভুল। তারপরও, আশাবাদী, স্বপ্নচারী, ইতিবাচক মানুষ হিসেবে প্রত্যাশা তো থাকবেই।
সমাজে লিঙ্গ বৈষম্য প্রকট। স্বাভাবিক চোখেও আমরা দেখতে পাই। আর কাণ্ডজ্ঞানের চশমা পরা থাকলে এটার চরম মাত্রা আপনি স্বচক্ষে দেখতে পারবেন। একটা সময় ছিলো যখন ভাবা হতো পুরুষ মানুষ পরিবারের একমাত্র যোগানদাতা। তাই, ভালোটা খাওয়ার অধিকার তারই। এটা তার প্রাপ্য অধিকার বিবেচিত ছিলো। মেয়েরা শ্বশুর বাড়ি চলে যাবে তার তো এ পরিবারে ভূমিকা নাই। এখনো আমরা সেই পুরুষতান্ত্রিকতার বেড়াজাল ভাঙতে পারিনি। আমরা আমাদের মা-বোন-কন্যার এ বৈষম্যের কবল থেকে মুক্ত করতে পারিনি।
এ সমাজে মত প্রকাশ করতে দেয়া হয় না মা-বোন-কন্যাদের। তাদেরকে দূর্বল-চিত্ত ভেবে মত প্রকাশের অযোগ্য বিবেচনা করা হয়। শিশুকাল থেকেই নারীরা সমাজে বৈষম্যের শিকার। পুরুষ-মুরুব্বিতান্ত্রিকতার জোরে এখানে কেউ কিছু বলতে পারে না। আজব এক সিস্টেম! যেখানে সবার পারস্পরিক আলোচনার ভিত্তিতে সব হওয়ার কথা; সেখানে পুরুষতান্ত্রিক-মুরুব্বিয়ানার ক্ষত।
নারীর অধিকারহীন করে এমন ধরনের কার্যকলাপ সবই নোংরা মানসিকতার পরিচয় বহন করে। সভ্য সমাজ ও সভ্য মানুষের মধ্যে এগুলোর কোন ঠাঁই নেই।
নারী-পুরুষ আমরা সবাই মানুষ। মনুষ্যত্ববোধই মানুষের ধর্ম। এর বাইরে মানুষের আর কোন পরিচয় নেই। কারন, মানুষের সাথে সম্পর্কিত প্রত্যেকটি বিষয় নির্দিষ্ট সময়ের পর উপযোগিতা হারালেও; মানুষ মানুষই রয়ে যায়।