আজকে যে বিষয়টি নিয়ে বিশ্লেষন করতে যাচ্ছি সেটি খুবই স্পর্শকাতর একটি বিষয়। 'জারজ' নিয়ে। জারজ একটি ঘৃনিত শব্দ বলে সমাজে প্রচলিত। যা একবার কোন মানব সন্তানের সাথে ঘটে গেলে, সারা জীবনের জন্য সে সামাজিক গ্রহনযোগ্যতা হারায়।
সমাজ জারজকে গ্রহন করতে চায় না। কারন, তার পিতামাতা বিবাহ বহির্ভূত যৌনাচারের মাধ্যমে তাকে জন্ম দিয়েছে। এটাই একমাত্র কারন। এর বাইরে আর কোন কারন ব্যাখ্যা করার মত আছে বলে আমার জানা নেই।
জারজ শব্দটির সাথে তিনটি বিষয় জড়িত। বিবাহ, যৌনাচার এবং বৈধতা। প্রথম শব্দটি প্রশ্নবিদ্ধ, দ্বিতীয়টি প্রাকৃতিক ব্যাপার, আর তৃতীয়টি আপেক্ষিক। যাহোক, মূল আলোচনায় যাওয়া যাক।
প্রথমত, বিবাহ বহির্ভূত যৌনাচার সম্ভব। কিন্তু, অস্বীকৃত। বিবাহ বহির্ভূত যৌনাচারের মাধ্যমে সন্তান জন্মদান সম্ভব। কিন্তু, সেটা অবৈধ। সম্ভব, অস্বীকৃত আর অবৈধ তকমা জুড়ে দিয়ে স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়াকে কেন প্রশ্নবিদ্ধ করা হলো? কারন, মানুষ সামাজিক জীব হওয়ায় এখানে সমাজ কতৃক নিগৃহিত হয়েছে। কিন্তু, অন্য কোন বিকল্প তো থাকা উচিৎ ছিলো! তা না রেখে হঠাৎ করে নদীর মূখে বাঁধ দিয়ে দিলাম। এটা তো বোগাস মার্কা একটি কর্ম হয়ে গেলো!
দ্বিতীয়ত, দু'জন মানুষের প্রাকৃতিক কর্মের ফসল একটি মানব সন্তান। সেটা বৈধ বা অবৈধ কোন ঘটনা হবে কেনো? এটি একটি প্রাকৃতিক ব্যাপার। এখানে মানুষ জোর করে বৈধতা বা অবৈধতার তকমা জুড়ে দেয়ার অধিকার রাখে না। প্রকৃতিকে তার আপন গতিতে চলতে দিতে হবে। নদীতে বাঁধ দেয়ার ফলে বন্যা হচ্ছে দেশে। তেমনি, যৌনতাও একটি প্রাকৃতিক বিষয় হওয়ায় এখানে বাঁধ দিলে সমস্যা তো হবেই।
তৃতীয়ত, যে জন্ম গ্রহন করল, সে তো কোন প্রচলিত পাপ করেনি। তাহলে, এটার দায়ভার কেনো তার উপর চাপানো হবে? সমাজ তার খেয়াল-খুশি মত চলতে পারে না। কেননা, সমাজ মানুষের জন্য; মানুষ সমাজের জন্য নয়। মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখতে হবে। অন্য কোন ট্যাগ দিয়ে দেখা যাবে না। সেটা অন্যায় হবে।
চতুর্থত, সিস্টেমের দোহায় দিয়ে কেনো একজন সুস্থ্য-স্বাভাবিক মানুষের অধিকার বঞ্চিত করা হবে? আপনাদের ভাষ্যমতে, সে জারজ হতে পারে; কিন্তু সে তো মানুষ। মানুষ যদি হয়ে থাকে তাহলে তার তো সুস্থ্য-স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার অধিকার অবশ্যই রয়েছে। আর একটি কথা আপনি যে ধর্মেরই হোন না কেনো, আপনার যদি সৃষ্টিকর্তা একজন থেকে থাকে তাহলে তারও তো সেই সৃষ্টি করেছে নাকি! সৃষ্টিকর্তা যদি তাকে সৃষ্টি করতে পারে তাহলে অধিকার দিতে সমস্যা কোথায়?
পঞ্চমত, জারজ বলে কেনো তাকে সমাজচ্যূত করা হবে? সে তো মানুষ। জন্ম যেভাবেই হোক। এ সমাজেরই কেউ তো তাকে জন্ম দিয়েছে।
ষষ্ঠত, বিয়ে কি আসলেই যৌনতার বৈধতা দেয়? নাকি, মহিলাদের দাসী এবং যৌনদাসী হতে বাধ্য করে বা যৌনতায় বাধ্য করা হয়! সচরাচার যেটা দেখা যায়, বিয়ে হলে মেয়েরা তার স্বামীর ঘরে যায় এবং স্বামীর সেবায় ব্রত হয়। আর এলাকার ময়-মুরুব্বিরাও বলে, পতি-ভক্ত নারীই উত্তম। এটাই তো প্রমান করে যে বিয়ে মেয়েদের দাসীতে পরিনত করে।
সপ্তমত, আমার কাছে বিয়ে হলো পতিতাবৃত্তির বৈধতা দান করে! কারন, প্রচলিত অর্থে যাকে আমরা পতিতা বলি সে টাকার বিনিময়ে যৌনতায় সম্মত হয়। আর বিবাহিত নারী বলি যাকে সে ভরণ-পোষনের শর্তে যৌনতায় সম্মত হয়! পার্থক্য শুধু একজন বন্দি আর একজন নয়। বিবাহিত নারী যেহেতু একজনের সাথে যৌনাচার করার শর্তে ভরণ-পোষন পায় সেহেতু তার অন্য সকল চাহিদা ভরণ-পোষনের আওতাভুক্ত। কিন্তু, যে নারী পতিতাবৃত্তি করে তার তো ভরণ-পোষন নিজের, তাই সে অনেকের সাথে যৌনাচার করে অর্থের জন্য, টাকার জন্য। সর্বোপরি, নারীর শিক্ষা এবং আত্মনির্ভরশীলতার প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। তানাহলে, নারী-মুক্তি আদৌও সম্ভব নয় বলে বোধ করি।
অষ্টমত, আমি ব্যক্তিগত ভাবে জারজ বা বৈধ মানুষ বলে কোন বিষয় আছে বলে মনে করি না। কারন, এ পৃথিবীতে জন্ম নেয়া প্রত্যেকটা মানুষকে আমি মানুষ মনে করি। তার জন্ম প্রক্রিয়া আমার কাছে কোন গুরুত্ব বহন করে না। এটা থাকাও অনুচিত। যারা এটাকে ধারন করে তারা মূর্খ, মনুষ্য বিদ্বেষী, মানবতা বিরোধী।
নবমত, জারজ শব্দটার উৎপত্তি বিবাহের সাথে সম্পর্কিত। এখন, বিবাহ শব্দটাও অনেক প্রশ্নবিদ্ধ একটি শব্দ। একটি প্রশ্নবিদ্ধ শব্দ আরেকটি প্রশ্নবিদ্ধ মানবতা বিরোধী শব্দের জন্ম দেবে এতে কোন সন্দেহ নেই।
সর্বশেষ, জারজ শব্দটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর স্বার্থ হাসিলের জন্য সৃষ্ট। যাদের ভিতরে মানবতাবোধ নেই তারা মানুষকে শ্রেণীকরণ করে। জারজ তেমনি একটি চরম মানবতা বিরোধী শ্রেণীকরণ। মানুষ মানুষই। তার ধর্মীয়, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় প্রভৃতি শ্রেণীকরণ থাকবে কেনো? কালের বিবর্তনে হয়তো একদিন এগুলো বিলুপ্ত হবে।