সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

বাস্তবতা এবং আবেগের আস্ফালন

বাস্তবতা এবং আবেগ দুটো বিপরীতমূখী জিনিস। তারপরও আবেগ না থাকলে বাস্তবতাকে বোঝা যায় না। ঠিক যেমন খারাপ না থাকলে ভালোকে উপলব্ধি করা যায় না। আমার বিরোধের যায়গাটা হলো অতি-আবেগে বাস্তবতা বিবর্জিত কর্মকাণ্ড।

নিজের জন্য কোনটা ঠিক বা বেঠিক এটা অন্তত বোঝার সক্ষমতা আমাদের অর্জন করা একান্ত প্রয়োজন। যেমন ধরুন,

বর্তমানে কর্পোরেট দুনিয়ায় রিয়েলিটি শো নামে একটি অতি আবেগের যায়গা তৈরি হয়েছে। এমনিতে সব যায়গায় একটা সেলিব্রেটি সেলিব্রেটি ভাব থাকে; তার উপর ডান্ডাবেড়ি। এখনকার ছেলে-মেয়েরা ম্যাচিওরিটি অর্জন করার আগেই, বুঝতে শেখার আগেই নিজের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ঠিক করে ফেলে। সেটা অর্জন করার মত ক্ষমতা সে অর্জন করতে পারবে কিনা সেটাও তার আওতার বাইরে থাকে তখন। চোখের রঙিন চশমা যখন খুলে পড়ে তখন দিশেহারা অবস্থা।

আরো একটা সমস্যা আছে, সেটা হচ্ছে, আবেগের বশে অনেকেই নিজেকে ফিল্মি হিরো মনে করে। এটা খুবই খারাপ। জীবনের জন্য অশনি সংকেত। আগে এটুকু বুঝতে হবে যে, সবার জন্য সবকিছু না। এর সাথে বিকল্প চিন্তা-ভাবনাও থাকতে হবে। কারন, চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌছানোর পর চাওয়া-পাওয়ার আর কিছু থাকে না। আগে তো একটা নির্দিষ্ট লক্ষ্য ছিলো, এখন তো পাওয়ার কিছু নেই। এরপর থেকে নিজের ভেতর শূন্যতা কাজ করবে।  আগে একটা লক্ষ্য ছিলো, এখন তো সেট শেষ, তাই একাকিত্ব অনূভব হবে।  মানে আপনি বেকার। বেকারত্বের জ্বালা প্রত্যেক পর্যবেক্ষনশীল বেকার মাত্রই বোঝেন।

নারীর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ন বিষয়টা হচ্ছে আত্মমর্যাদাবোধ, মূল্যায়নবোধ। নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়ে কোন কিছু অর্জন করাকে কৃতিত্ব বলা যায় না। সেটা মেকিতে পরিনত হয়। সেটার মধ্যে নিজস্বতা বলে কিছু থাকে না। অনেকে আছে স্রোতে গাঁ ভাসিয়ে দেয়। বেলাশেষে কান্না আর একাকিত্ব তাদের নিত্য সহচর হয়। সিদ্ধান্ত গ্রহনের ক্ষেত্রেও যারা স্রোতে গাঁ ভাসিয়ে দেয়, তাদের একই অবস্থা।

নিজের ভেতর আত্মবিশ্বাস থাকাটা ভালো। তার চেয়ে বেশি প্রয়োজন যেটা, সেটা হচ্ছে নিজের সম্পর্কে সঠিক ধারণা রাখা। যাদের নিজেদের সম্পর্কে কোন ধারণা নেই। তারা নিজেদের জীবন নিয়ে সন্তুষ্ট হতে পারে না। যার নিজের সম্পর্কে কোন ধারণা নেই তার আত্মবিশ্বাস ঠুনকো। সে জীবন সম্পর্কে অনীহ এবং প্রতি পদে পদে সে ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে; এতে কোন সন্দেহ নেই। বিশ্বাসের চেয়ে আস্থাই আপনাকে ধাপে ধাপে এগিয়ে নিয়ে যাবে; এতে কোন সন্দেহ নেই।

কারন, নিজের প্রতি আস্থা তৈরি হয় নিজের সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকলে। আর বিশ্বাস তো বিশ্বাসই। অজানা অচেনা এক আমি। ভালো কিছু করতে হলে আগে আবেগকে নিয়ন্ত্রন করতে শিখতে হবে, বাস্তবতা বুঝতে শিখতে হবে, নিজের সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকতে হবে।

আবেগের কাছে নিজেকে ছেড়ে দিলে সেটা নিজের পায়ে নিজে কূড়াল মারার মত কাজ হবে। কর্পোরেট দুনিয়ায় স্বার্থ ছাড়া কেউ একপা আগায় না। যে সকল লোক কর্পোরেট ব্যবসার নামে রিয়েলিটি শোয়ের মাধ্যেমে নিজেদের প্রচারনা বাড়ানোর চেষ্টা করে তাদের ফাঁদে সহজে ধরা দিলে আপনি হয়ে উঠবেন ব্যবহার্য জিনিস। আপনি তখন আর মানুষ থাকবেন না। হয়ে উঠবেন পন্য। অনেকে এটাকে উপভোগ্য মনে করে। কিন্তু, আপনি যদি পা পিছলে পড়ে যান তাহলে আপনাকে টেনে তোলার লোক পাবেন না; উল্টো আপনার অবস্থা দেখে সবাই হাসাহাসি করবে। এ রকম পরিস্থিতিতে আপনার নিজের প্রতি যে আস্থাটুকু ছিলো তা ধ্বংস হতে বাধ্য।

নিজেকে সেলিব্রটি ভাবাটা সহজ; মানুষকে বলানোটা অনেক অনেক কঠিন। নিজেকে যদি সেলিব্রেটিরুপে প্রকাশ করতে চান তাহলে নিজের সক্ষমতা এবং যে বিষয়টি চুজ করবেন সেটা নিয়ে বিস্তর ভাবুন। পাশাপাশি অবশ্যই নিরাপত্তার বিষয়টিও মাথায় রাখা জরুরি।

আমি বলছি না এগুলো খারাপ বা ভালো। তার আগে দরকাল হলো, জগৎ ও জীবন সম্পর্কে বিস্তর জানা শোনা। সময়ের তাগিদ থাকে। এটা বুঝতে না পারলে, আপনি দাড়িয়ে থেকেও পিছিয়ে পড়বেন। যেহেতু যুগের বিবর্তনে নতুনত্ব এসেছে সেহেতু তাকে জেনে, শুনে, বুঝে গ্রহণ করতে হবে।

যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে তারা বিসিএস ছাড়া কিছুই বোঝে না বা পারিবারিকভাবে এটার জন্য এক ধরনের প্রেশারও ক্রিয়েট হয় অনেকের। বিসিএসের বাইরে যে জগতটা অনেক বড় এটা মনে হয় তাদের জানা-শোনার বাইরে। আসলে দেশে এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি করেছে কতিপয় লোক যেন বিসিএসই একমাত্র মেধা প্রকাশের যায়গা। আমার জানা মতে, বিসিএস এবং চাকরির পরিক্ষাগুলো পরিশ্রমের যায়গা। মেধা-মননের পরিচয় দেয়ার যায়গা আলাদা। এই আলোচনায় এটা নিয়ে আসার কারনটা হলো অনেকের এটা বাস্তবতা বিবর্জিত আবেগের যায়গা।

সরকারী চাকরি ছাড়া যেন এদেশে শিক্ষিত লোকের জীবনটাই বৃথা। আজব লাগে ব্যাপারটা! অনেকের সরকারী চাকরির আবেদনের বয়স পার হয়ে যায় তারপরও না পাওয়ার বেদনায় হাহুতাশ করে সময় নষ্ট করতে থাকে। দেশে সরকারি চাকরির নিয়োগ প্রক্রিয়া যে ধরনের তাতে করে ধৈয্য ধরে সফলতার সাথে কার্যক্রম শেষে নিয়োগ পেতে পেতে আধা বয়স শেষ। তখন কোন মেয়েই আর টাকলা চুলপাকা লোককে বিয়ে করতে চায় না! যদিও টাকের সাথে টাকার একটা গভীর সম্পর্ক রয়েছে!