সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

বাংলাদেশ স্বাধীন না হলে

বোধহয় মাটির দোষ! এখনো অনেক বাঙালি মনে করে বাংলাদেশ স্বাধীন না হয়ে পাকিস্তানের কলোনি থাকলে বাঙালি অনেক শক্তিশালী জাতে পরিনত হতো! তাদের সঙ্গে কথা বলে মনে হয়েছে, এটা নিছক ভারত বিরোধীতা করা ছাড়া আর কিছু নয়। একপ্রকার রাজনৈতিক অনুভূতির খেলা। বলি কি ভাই, ভারতের কিন্তু আপনার বিরোধীতা দেখার সময় নাই বা এটা দিয়ে তার কিছু যায় আসে না! এটা ঠিক, পাশের কোন বড় দেশ ছোট দেশকে একটু শোষন করতে চেষ্টা করবে বা করেও। তাই বলে তারা কখনো পাশের ছোট দেশ দখল বা সাধারন জনগনের কর্মে হস্তক্ষেপ করে না। কারণ, তারা ভাল করেই জানে এটা প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় চিন্তা-ভাবনা। আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় এগুলো অপাক্তেয়। ভারতের তো বাংলাদেশ দখলের প্রশ্নই আসে না! দখল করলে ধকল সামলাতে পারবে না। রাজনীতি, অর্থনীতি, ধর্মসহ সব ক্ষেত্রে ব্যাপক ঝামেলা বেঁধে যাবে। কাজেই, প্রশ্নই ওঠে না। বরঞ্চ, তারা অন্য সব শোষন বাদ দিয়ে সিস্টেমেটিক অর্থনৈতিক শোষনের পথ বেছে নেবে। পাকিস্তান আমাদের কলোনি করে রাখতে চেয়েছিল সর্ব দিক দিয়ে শোষন করার জন্য। কিন্তু, তারা বড় ভুল করেছিল এবং মাশুলও দিয়েছে। ভারত সেটা দেখে শিক্ষা নিয়েছে। তারা তো এ ভুল কখনোই করবে না। তারা আমার দেশে আসবে বিনিয়োগ-ব্যবসা করতে। আধুনিক রাষ্ট্র-ব্যবস্থায় এক দেশ অন্য দেশে গিয়ে নিয়মমাফিক বিনিয়োগ-ব্যবসা করবে এটা স্বাভাবিক। এটা নিয়ে হায় হায় করার কিছু নেই!

আন্তর্জাতিক রাজনীতির মাঠে সবাই সব সময় নিজের স্বার্থ হাসিলের ধান্দায় থাকে। আর এটার সাথে অনেক জটিল কূটনীতি জড়িত থাকে। আর আন্তর্জাতিক রাজনীতি তো রয়েছে। কাজেই আপনি আমি ক্ষুদ্র মস্তিস্ক দিয়ে এটা বুঝতে পারবো না! বোঝার জন্য পড়তে হবে, জানতে হবে অনেক কিছু।

এবার আসি বাংলাদেশ পাকিস্তানের কলোনি থাকলে কি হত আর কি না হত সে বিষয়ে। এ ব্যাপারে আমি 'ইতিহাস' ও বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা দুটি বই 'অসমাপ্ত আত্মজীবনী' ও 'কারাগারের রোজনামচা' বই থেকে একপ্রকার আত্মজিজ্ঞাসা নিয়েছি। কারণ, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস আর শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন একসুত্রে গাঁথা। প্রত্যেক ইতিহাসের ছাত্র-শিক্ষক ও পাঠকমাত্র এটাকে অস্বীকার করতে পারে না। আর যদিও করে সেটা ইতিহাসের বাস্তবতা থেকে নয়। অন্যকোন কারণে!

০১. তার আগে একটু বলে রাখি, অনেক লোক আছে যারা এখনো মনে করে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভারত ভাগ না হয়ে ভারতবর্ষ থাকলে ভালো হতো। এত ভাগাভাগির কি দরকার! ঠিক আছে আপনার মতকে সমার্থন করতে না পারলেও আপনার  কথাকে সম্মান জানালাম। যদিও অবাস্তব কল্পনা! তার আগে আমার একটা প্রশ্নের উত্তর দেন? কখন একটা জাতি এক দেশ থেকে পৃথক হয়ে নিজস্ব জাতি-রাষ্ট্র গঠন করতে চায়?
আমি এটার একটাই কারন খুজে পেয়েছি, শোষন-অত্যাচারের মাত্রা যখন সীমা ছাড়িয়ে যায় তখন।
এখন আপনি ভালো করে ইতিহাস পড়ুন বুঝতে পারবেন কেন ভারত ভাগ হয়ে দুটো রাষ্ট্র হলো। অনেকে আবার ভকেটের মত প্রশ্ন করে তাহলে দুটো না, তিনটা হওয়ায় ভালো ছিল! দয়া করে, ইতিহাসটা পড়ুন, বুঝুন তারপর কথা বলুন। পড়লেই বুঝতে পারবেন।
শেখ মুজিবুর রহমান তার 'অসমাপ্ত আত্মজীবনী'তে হিন্দু কতৃক মুসলমান নির্যাতনের কাহিনী বলেছেন। এমনকি তিনিও একজন পাকিস্তান আন্দোলনের নেতা ছিলেন। 'ঐতিহাসিক বাস্তবতা' বলে একটা জিনিস আছে। যেটা সবার বোঝা উচিত। বিশেষ করে জাতির নেতাদের। এটি এমন একটা বিষয় না মানলেও তলে তলে ঠিকই কাজ করে যায়।
ভারতভাগের কাহিনী বোঝার জন্য শুধু ভারতভাগ পড়লে বোঝা মুশকিল। আগের-পরের ইতিহাসও পড়তে হবে। তবে নিরপেক্ষ কোন ইতিহাস লেখকের বই পড়তে হবে। দলকানা হলে হবে না।
০২. আমরা কেন ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানে যোগ দিলাম এবং ১৯৭১ সালে পাকিস্তান থেকে স্বাধীন হয়ে নতুন জাতি-রাষ্ট্র গঠন করলাম? তার জবাব,
ভারত ভাগ হয় মূলত শেরে বাংলা একে ফজলুল হকের লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে। কিন্তু, সে সময় ভূ-রাজনীতি ও ধর্মীয় সংঘাতের কবলে পড়ে মুসলমানরা বিশেষ করে বাঙালিরা এক মহা-ষড়যন্ত্রের কবলে পড়ে। বাঙালি একজাতি একপ্রাণ হওয়া সত্ত্বেও ষড়যন্ত্র করে ধর্মের দোহায় দিয়ে বাংলা মায়ের অঙ্গচ্ছেদ করা হয়েছিল। অনেকে ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গকে বাংলা মায়ের অঙ্গচ্ছেদ বলে মাতামাতি, দাঙ্গাহাঙ্গামা করলেও, ১৯৪৭ সালে বঙ্গভাগকে শুধু সমর্থন নয় জোরালো দাবি নিয়ে আন্দোলন করতে থাকে। ১৯০৫ সালে যারা বঙ্গভঙ্গ রদের আন্দোলন করে এর বেশিরভাগ ছিল এলিট শ্রেনী। তারা তাদের জমিদারী ও ব্যবসার স্বার্থে এ আন্দোলন করে। তাদের ব্যবসার বাজার ও কাঁচামালের জোগান পেতো পূর্ব বাংলা থেকে এবং সমস্ত কলকারখানা তৈরি করে পশ্চিমবঙ্গে। আর ১৯৪৭ সালে জাতীয়তাবাদী নেতারা ধর্মীয় উন্মাদনা ছড়িয়ে ভারতভাগের আন্দোলনে নামে। তখন এলিট শ্রেনী এই আগুনে তেল ঢালতে থাকে। এখানে অবশ্য শ্রেনী স্বার্থ জোরলো ভাবে দেখা দেয়। দাঙ্গাহাঙ্গামার মধ্য দিয়ে ভারত তিন টুকরো হয়ে দুটো রাষ্ট্রে পরিনত হয়।
অবশ্য যুক্তবাংলা গঠনেরও দাবি জানানো হয়। কিন্তু, এ দাবি অনেকে মেনে নিলেও, ষড়যন্ত্র করে তা দমিয়ে দেয়া হয়। আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক বলতেন যে, পাকিস্তান পেল মাথা কাঁটা বাংলা আর ভারত পেল দেহহীন মস্তক বাংলা।
আমরা পূর্ব বাংলার জনগন হয়ে গেলাম পশ্চিম পাকিস্তানের কলোনি। কলোনি বলার কারন তারা আমাদের নানান দিক দিয়ে শোষন করত।  আমাদেরকে তারা পাকিস্তানের অংশ হতে দেয়নি। এমনকি শোষনের হাতিয়ার হিসেবে তারা ধর্মের ন্যায় পবিত্র জিনিসকে ব্যবহার করতেও কসুর করেনি। উহারা বুঝি অন্য জাতের মানুষ। সত্যি তারা আমাদেরকে কখনো খাঁটি মুসলমান বলে মনে করতো না। শুধু পশ্চিম পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠি নয়, জনগনও আমাদেরকে মুসলমান মনে করত না। এটার প্রমান ইতিহাসে উজ্জ্বল। হিন্দুদের সংস্পর্শে থাকার কারনে এবং গায়ের রং কৃষ্ণবর্ণ হওয়ায় আমরা নাকি নিচু জাতের মুসলমান আর তারা মধ্য-প্রাচ্যের সন্নিকটে হওয়ার কারনে তারা উচু জাতের মুসলমান। শুনেছি পাকিস্তানে উচ্চ জাতের সিন্ধি গরু পাওয়া যায়। কিন্তু, উচু জাতের মুসলমান পাওয়া যায় এটা ইতিহাস না পড়লে জানতে পারতাম না। আবার এসব কারণে তারা আমাদেরকে বিশ্বাস করত না এমনকি সন্দেহ করত। হিন্দুর দালালও ভাবতো।  তাই তারা জনগন নয়, মাটিকে চাইতো। ইতিহাসের পাতায় তাদের কৃতকর্ম জঘন্যভাবে লেপ্টে আছে।
ক. ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে প্রানের বিনিময় মাতৃভাষার স্বীকৃতি পায় প্রানপ্রিয় বাংলা ভাষা। তারপরও নানান ষড়যন্ত্র চলে এটাকে রুদ্ধ করার জন্য। বাঙালি যাতে বাংলা ভাষায় কথা বলতে না পারে তার জন্য কতরকমের চাপাচাপি আছে তা তারা দেখেছিল। অনেক বাঙালি কর্মকর্তা-কর্মচারি বাংলাতে কথা বলত না, চাকরি যাওয়ার ভয়ে। আজকে বাংলাদেশ স্বাধীন না হলে বাংলা ভাষায় কথা বলা দুষ্কর হতো না শুধু, ধর্মীয় উন্মাদনায় (মিথ্যাচারে) বাংলা ভাষা বিলিন হয়ে যেতো। কারন পাকিস্তানের জন্ম ধর্মের গর্ভে। এবং সর্বকাজে তারা অস্ত্র হিসেবে এটাকেই ব্যবহার করে আসছে। উর্দুকে তারা মুসলমানের ধর্ম বানিয়ে ছাড়তো। আমার প্রানের বাংলা ভাষার মৃত্যু ঘটতো।
খ. ১৯৫৪ সালে নির্বাচনে জয়লাভ করলেও জনপ্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে তারা গড়িমসি করে এবং পরে মন্ত্রিসভা ভেঙ্গে দেয়। আবারও ১৯৫৬ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মন্ত্রিসভা গঠিত হয় এবং সেটা ভেঙ্গে দিয়ে সামরিক শাসন জারি করা হয়। ১৯৭০ সালেও একই কাহিনীর পূনরাবৃত্তি ঘটে। এককথায় আজকে যদি বাংলাদেশ স্বাধীন না হতো তাহলে বঙালিরা সবসময় পাকিস্তানিদের কাছে রাজনৈতিকভাবে শোষিত হতে থাকত অনবরত।
গ. ১৯৬২ সালে শিক্ষা আন্দোলন করে শিক্ষার অধিকার আদায় করতে হয় তাদের কাছ থেকে। কি আর বলব! শিক্ষার মত একটি মৌলিক মানবাধিকারকেও তারা হরণ করে।
ঘ. ১৯৬৬ সালে বাঙালির বাঁচার দাবি ৬ দফাকে তারা ষড়যন্ত্র করে রদ করতে চেষ্টা করে। বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে তারা হত্যারও ষড়যন্ত্র করে। ৬ দফার যে দাবিগুলো ছিল সেগুলো আমার কাছে একটিও অযৌক্তিক মনে হয়নি। একটু মন দিয়ে পড়লে বুঝতে সমস্যা হবে না। এই যৌক্তিক দাবিকে তারা মেনে নেয়নি। তারা আমাদের কথা বলার অধিকার কেড়ে নেয়, মানুষের বাক্-স্বাধীনতা হরণ করে। হত্যা, খুন, গুম, জেলজুলুমের স্টিম রোলার চালায়। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক এমনকি ধর্মীয়ভাবে তারা আমাদের শোষন করতে থাকে। ১৯৪৮-১৯৭১ সাল পর্যন্ত যত আন্দোলন সংগ্রাম হয়েছে সেগুলোর ইতিহাস এবং ৬ দফা ও তার প্রেক্ষাপট পড়লে বুঝতে সমস্যা হয় না এগুলো।
ঙ. অর্থনৈতিক শোষনের কথা নতুন করে বলার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। তারপরও, তারা এদেশের সম্পদকে পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়নে ব্যবহার করত। পশ্চিম পাকিস্তানে তিন তিনটা রাজধানী গড়ে তোলে পূর্ব পাকিস্তানের টাকায়। সর্বোচ্চ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করত পূর্ব বাংলা আর এই টাকা পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়ন কাজে ব্যয় করা হতো। পশ্চিম পাকিস্তানে কলকারখানা গড়ে ওঠে। পূর্ব বাংলায় তখন পর্যন্ত মূলধন গড়ে ওঠেনি।
এবার বলুন, বাংলাদেশ পাকিস্তানের কলোনি থাকলে আমরা কি শক্তিশালী জাতে পরিনত হতাম নাকি শোষিত জাতিতে পরিনত হতাম?
আর যারা বাংলাদেশকে ভারতের কলোনি ভাবতে পছন্দ করেন তাদের বলব, আজকে কাশ্মীর কি তার ন্যার্য হিস্যা পাচ্ছে? শিখ জাতি কি নির্যাতিত নয়? পশ্চিম বাংলার মানুষের ভ্যালু কোথায়? আসামের এবং কাশ্মীরের স্বাধীনতাকামীরা কি হত্যা, খুন, গুম হচ্ছে না? তাহলে?
আর সে সময় নেতারা ভালো করেই জানতো পাকিস্তানের সাথে যোগ না দিলে ভারতের কাছ থেকে স্বাধীনতা পাওয়া আদৌ সম্ভব নয়। কাশ্মীর বা আসাম, নাগাল্যান্ড, পাঞ্জাবী শিখ বা ভারতের অন্যান্য অংশের স্বাধীনতাকামীদের মত অবস্থা হতো। পাকিস্তানের সাথে যোগ দেয়ার সবচাইতে বড় কৌশল হলো আঞ্চলিক দূরত্ব। স্বাধীনতা পেতে এত বেগ পেতে হতো না! নেতৃত্ব আমাদের ঠিক ছিল। কিন্তু অভ্যন্তরীন রাজাকারের নির্বুদ্ধিতা, বেঈমানীর শক্তি স্বাধীনতাকে পিছিয়ে দেয়।