সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

ধর্ষনবাদ

মানুষ খাইতে খাইতে স্বাস্থ্যের অনেক উন্নতি করেছে। কিন্তু, মন-মানসিকতারর অবনতিই ঘটেছে। 
ধর্ষন নিয়ে ইদানিং খুব কথাবার্তা চলছে। বিশেষ করে রেইনন্ট্রি হোটেলের ধর্ষনের ঘটনাটি নিয়ে। এটা নিয়ে বহুরকমের কথা চালাচালি হচ্ছে সমাজে। সবচাইতে মজার ব্যাপার হল, কিছু সংখ্যক মানুষ যুক্তি দিয়ে এটার যথার্থতা প্রমাণ করে বৈধতা দানের চেষ্টা করছে। আমার তো মনে হয় এটা বংশপরম্পরায় তাদের মধ্যে জেনেটিক্যালি রয়ে গেছে। 
এই বৈধতা দানের চেষ্টা প্রত্যক্ষভাবে ধর্ষনকে উৎসাহিত করা, নতুন নতুন ধর্ষক তৈরি করা। যারা এটাকে বৈধতা দানের চেষ্টা করছেন তাদেরকে বলব, আপনার মা-বোন বা আত্মীয়-স্বজন যদি ধর্ষনের স্বীকার হতো তাহলে আপনি কি করতেন? বা আপনার মানসিক অবস্থান কি হতো? আমার অভিজ্ঞতা বলে, আইনি প্রক্রিয়ায় বা সামাজিকতার চাপে কিছু করতে না পারলেও অন্তত গালি দিয়ে ধর্ষকের চৌদ্দ গোষ্ঠি উদ্ধার করে ছাড়তেন। সর্বোপরি, আল্লার কাছে বিচার দিয়ে ক্ষান্ত হতেন। তবুও, আপন জনের এরকম পরিস্থিতিতে নিজের মন ভালো থাকে না কখনো।
তাই যদি হয় তাহলে কেন নিজের ধর্ষনকামী মনটাকে নিয়ন্ত্রনে রাখছেন না? ধর্ষনকামী মনটাকে কেন বিদায় জানাচ্ছেন না?
আসুন, নিজের মা-বোনকে যেমন ভালোবাসি, সম্মান করি ঠিক তেমনি পৃথিবীর প্রত্যেক মা-বোনকে, প্রত্যেক নারীকে সম্মান করতে শিখি।
হয়তোবা, রেইনন্ট্রির একটি ধর্ষনের ঘটনা আমাদের চোখ এড়াতে পারিনি কিন্তু এরকম অজস্র ধর্ষনের ঘটনা রয়েছে যেগুলো সম্মানের ভয়ে, সমাজের ভয়ে, পুরুষতান্ত্রিকতার থাবায়, ক্ষমতার দাঁপটে, অর্থের লীলা-খেলায় লোকচক্ষুর অন্তরালে রয়ে যায়।
অনেকে পোষাকের দোষ দিয়ে ভিকটিমের উপর দোষ চাপিয় দিয়ে ধর্ষকের অপরাধ আড়াল করে ফেলছে। আরে ভাই, যেখানে আড়াই মাসের শিশু ধর্ষিত হয় চুল-দাড়ি পাঁকা চোঁদনবাজের কাছে সেখানে পোষাক তো ধর্ষনের কোন রকম কারণের আওতায়ই আসে না। ঐ শিশুটির কি পোষাকের বোধ আছে? ধর্ষন ধর্ষনই। যেধরনের যৌনতাকে আইন ও সমাজ স্বীকৃতি দেয় না, যেটা মানবাধিকারে চূড়ান্ত লঙ্ঘন। সেটাকে তো পোষাক দিয়ে আবৃত করার কোন মানেই হয় না।
অপরাধ কখনোই প্রাচীর মানে না। অপরাধকে অপরাধ বলতে না পারাটাও অপরাধ বা অপরাধকে উৎসাহিত করা বোঝায়।
{ধর্ষণের সংবাদহীন কোনো দিন আর নেই। ধর্ষণের শিকার যাঁরা হচ্ছেন, তাঁদের বিশেষ কোনো জনমিতিক চরিত্র আর নির্দিষ্ট করা যায় না। শিশু থেকে প্রৌঢ়, ধনী থেকে দরিদ্র, গ্রাম কিংবা শহরবাসী, বিবাহিত বা অবিবাহিত, প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী, কামিজ-হিজাব-শাড়ি-টপস পরিহিত, যে-কেউ এর শিকার হতে পারেন। ধর্ষণের কোনো নির্দিষ্ট পরিসর কিংবা সময় নেই, যেখান থেকে গা বাঁচিয়ে চলা যায়। ঘরের ভেতর, উৎসবের ময়দান, মিলনায়তন, কর্মক্ষেত্র কিংবা আসা-যাওয়ার পথ, সর্বত্র লোলুপ থাবা। ধর্ষকের আগ্রাসনে আক্রান্ত হন যাঁরা, তাঁদের অধিকাংশ নারী, কিয়দংশ পুরুষ বা বালক। পুরুষতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে পুরুষ বা বালক ধর্ষিত হলে তা প্রকাশ করা আরও কঠিন হয়ে ওঠে।

গণমাধ্যমে যতটুকু জানি, তাও শুধু ডুবোপাহাড়ের ভাসমান চূড়াটুকু। তারপরও ধর্ষণের যতগুলো ঘটনা প্রতিদিন নজরে আসে, তার পৌনঃপুনিকতা প্রমাণ করে, ধর্ষণ অত্যন্ত স্বাভাবিক আচরণ বলে গণ্য হয়ে উঠেছে। যতই খারাপ লাগুক শুনতে, আমাদের মেনে নিতে হবে, ধর্ষণকে আমরা যাপিত সংস্কৃতির অংশ করে তুলেছি। ধর্ষণকে অপরাধ হিসেবে না দেখা, ধর্ষণের দায় ভিকটিমের ওপরেই বর্তানো এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ধর্ষণের বিচার ও অভিযুক্ত ব্যক্তির শাস্তি না হওয়া এ ধরনের একটি সহিংস পরিবেশ তৈরি করেছে। এর এই পরিবেশেই একজন অভিযুক্ত ধর্ষকের পিতা নির্দ্বিধায় পুত্রের ভয়ংকর অপরাধকে ‘জোয়ান বয়সে একটু-আধটু করা’ বলে বৈধতা দেন।-প্রথম আলো}
এই ধর্ষন সংস্কৃতি থেকে বের হতে প্রথমে ধর্ষনকামী মনটাকে বিদায় জানাতে হবে। ধর্ষককে চুড়ান্ত শাস্তি দিতে হবে (সবচাইতে উপযুক্ত শাস্তি হলো ধর্ষকের লিঙ্গ খোঁজা করে দেয়া। যখন কোন ধর্ষনকামী তাকে দেখবে এমনি ধর্ষন করার কথা মাথায়ই আসবে না। দামড়া-গরুর মত অবস্থা করে দেয়া, মন চাইলেও কাজ হবে না)। নৈতিকতা-মূল্যবোধের চর্চা নিশ্চিত করতে হবে।