সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

বাল্যবিয়ের আদ্যপান্ত

ভূমিকাঃ 
সন্তান জন্ম নেয়ার পরে বাবা মায়ের সব সাধ থাকে সন্তানকে ঘিরে। তার সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের কথা ভাবতে ভাবতে দিশেহারা হয়ে যান বাবা-মা। অথচ, সেই সন্তানকেই একসময় বাল্যবিয়ের মত মরনফাঁদে ফেলতে দ্বিধা করেন না।
আর দরিদ্র্য পরিবারে মেয়ের বিয়ে না হওয়া মানেই তার জন্য বাড়তি খরচের চিন্তা। কিন্তু, খরচ কমাতে গিয়ে বাবা-মা একবারও ভেবে দেখছেন না তার সাধের সন্তানের কি ক্ষতি করছেন!
কন্যা শিশুকে বিয়ে দেয়ার কিছু দিনের মধ্যে শ্বশুর বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়া হচ্ছে, আবার যায়গা হচ্ছে সেই বাবা-মায়ের কাছে। এ ধরনের ঘটনা আমাদের সমাজে অহরহ ঘটছে।
একটি সুস্থ জাতি পেতে হলে প্রয়োজন সুস্থ, সবল শিক্ষিত মা। কারন, মা যদি শিক্ষিত হয়, শারীরিকভাবে সুস্থ থাকে তাহলে তার সন্তান সুস্থভাবে বেড়ে উঠবে, বলাই বাহুল্য! আর জাতি পাবে একটি সুস্থ, সুন্দর ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। এজন্যই বিজ্ঞ নেপোলিয়ন যথার্থই বলেছিলেন, Give me good mothers, I will give you a good nation. কাজেই, শিক্ষিত জাতি গঠনে, শিক্ষিত মা প্রয়োজন।
কিন্তু, বাল্যবিয়ের কারণে জাতির একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ প্রজন্ম পাওয়ার স্বপ্ন অঙ্কুরেই বিনষ্ট হচ্ছে। আগামী প্রজন্মের সুস্থ ও সুনাগরিক হিসাবে গড়ে উঠতে বাল্যবিয়ে একটি বড় ধরনের বাঁধা।
বাল্যবিয়ের কারণে ছেলে-মেয়ে উভয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও, মেয়েদের ক্ষেত্রে এর ভয়াবহতা মারাত্মক।
বাল্যবিয়ে বর্তমান সময়ে একটি বিরাট সামাজিক সমস্যা। দেশের প্রচলিত আইন কানুনের তোয়াক্কা না করে প্রাচীন ধর্মীয় মূল্যবোধকে আদর্শ মেনে এ সময়ের আদর্শ, মূল্যবোধ বিসর্জন দিয়ে আমাদের দেশের অভিভাবকরা তাদের কন্যাদের বাল্যকালেই বিয়ে দিয়ে দায়সারা গোছের দায়িত্ব পলন করছে। বাংলাদেশের বর্তমান রাষ্ট্রীয় আইন মতে, ২১ বছরের নিচে ছেলে এবং ১৮ বছরের নিচে মেয়ের বিয়ে হলে তা বাল্যবিয়ে বলে গন্য হবে। নিচে বাল্যবিয়ের আদ্যপান্ত তুলে ধরা হলঃ

বাল্যবিয়ের সংজ্ঞাঃ
বাল্যবিয়ে নিরোধ আইন অনুযায়ী, বাল্যবিয়ে বলতে বাল্যকাল বা নাবালক বয়সে ছেলে-মেয়েদের মধ্যে বিয়েকে বোঝায়।
এছাড়া বর-কনের উভয়ের বা একজনের বয়স বিয়ের দ্বারা নির্ধারিত বয়সের চেয়ে কম বয়সে হলে তা আইনে বাল্যবিয়ে বলে চিহৃিত।
জাতিসংঘের আইন অনুযায়ী, ১৮ বছরের কম বয়সের প্রত্যেক মানবকে শিশু বলে গণ্য করা হয়। কাজেই, ১৮ বছরের আগে বিয়ে হলে তা বাল্যবিয়ে হিসাবে গন্য করা হয়।
বাল্যবিয়ে নিরোধ আইন ২০১৪ অনুযায়ী, ছেলের বয়স ২১ ও মেয়ের বয়স ১৮ বছরের কম হলে প্রস্তাবিত আইন অনুযায়ী তা বাল্যবিয়ে এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে গন্য হবে।
চিকিৎসকের ভাষায়, ১৮ বছরের আগে একটি মেয়ের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ঘটে না। এজন্য, ১৮ বছর পর্যন্ত একটি মেয়েকে শিশু বা কিরোরী বলা হয়। কাজেই, ১৮ বছরের আগে মেয়ে বিয়ে দেয়াকে শিশু বিয়ে অর্থাৎ বাল্যবিয়ে বলে।

বাল্যবিয়ের ইতিহাসঃ
বাল্যবিয়ের সূচনাকালের কোন সুনির্দিষ্ট ইতিহাস না থাকলেও ধরে নেয়া যেতে পারে ঘর বাঁধার বা সমাজবদ্ধ হওয়ার কালই হল এর সূচনাকাল। ইউরোপীয় পরিব্রাজকদের রচনা থেকে জনা যায়, ষোড়শ শতকের অষ্টম দশকেও এর প্রচলন ছিল। 
এ বাল্যবিয়ে বাংলার হিন্দু পরিবারগুলোর মধ্যে প্রাচীনকাল থেকেই প্রচলিত ছিল। হিন্দু সমাজে ছেলেমেয়েদের বিশেষ করে মেয়েদের, বাল্যকালে বয়ঃসন্ধির পূর্বেই বিয়ে দেয়াকে ধর্মীয় দায়িত্ব বলে মনে করা হতো। প্রচীন হিন্দু আইন প্রণেতা মনু নারীর বিয়ের বয়সের যে বিধান দিয়েছেন তা হলো, তিরিশ বছরের পুরুষ বারো বছরের কন্যাকে বিয়ে করবে। চব্বিশ বছরের পুরুষ আট বছরের কন্যাকে বিয়ে করবে, নইলে ধর্ম লঙ্ঘিত হয়। 
অষ্টাদশ শতাব্দিতে বাল্যবিয়ে সম্বন্ধে স্ক্রাফটন বলেছিলেন, এই উপমহাদেশের ছেলে-মেয়েদের শিশুকালে বিয়ে দেয়া হত। ১২ বছর বয়সে একজন রমনীর কোলো একটি সন্তান এটা ছিল সাধারন দৃশ্য। এই দৃশ্যের পূনরাবৃত্তি ঘটার মূল কারণ ছিল সামাজিক বিধি।
সে সময়ে ৬-৭ বছরের পরে মেয়ে অবিবাহিত থাকা ছিল পরিবারের পক্ষে অসম্মানজনক ও নিন্দনীয়। সেই পরিবারের সাথে সামাজিক ও ধর্মীয় সম্পর্ক ছেদ করে একঘরে করে দেয়া হতো।
এই নিন্দার হাত থেকে নিস্কৃতির উপায় ছিল এই বাল্যবিয়ে। এতো গেল অষ্টাদশ শতাব্দির কথা। উনবিংশ শতাব্দির মাঝামাঝি সময় থেকে বাল্যবিয়ের বিরুদ্ধে তীব্র সামাজিক আন্দোলন শুরু হয়।
আজ প্রায় এক শতাব্দীকাল অতিক্রান্ত। আজ মানুষ শিক্ষিত, রুচিশীল, উন্নত। শিক্ষার হার ক্রমবর্ধমান। তবু, আজও দেশে বাল্যবিয়ের হার ৬৬ শতাংশ।

বাল্যবিয়ের কারণঃ
কিছু কার্যকারণের বিশ্লেষন-
আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় নারীর প্রতি নানা ধরনের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি প্রচলিত রয়েছে।
আমাদের দেশে পুরুষ শাসিত সমাজ ব্যবস্থায় নারীদের অবস্থান পেছনের সারিতে। এখানে মেয়েদের বোঝা স্বরুপ বিবেচনা করা হয়। তাদের মূলত পণ্যদ্রব্য হিসাবে দেখা হয়। যেন পুরুষদের সেবা করতেই মেয়েদের জন্ম।
অধিকাংশ পরিবারই তাদের মেয়ে সন্তানকে বোঝা স্বরুপ মনে করে। অভিভাবকগন মেয়েদের বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত এক অজানা আতঙ্কে ভোগেন।
এই বিষয়টি একেবারে সুবিধা বঞ্চিত দরিদ্র্য পরিবার থেকে শুরু করে উচ্চবিত্ত পরিবার সকল শ্রেনীরই প্রায় একই রকম অবস্থা।
যার ফলে মেয়ে সন্তান জন্মের পর থেকে মেয়ের পড়ালেখা, পেশা এগুলো নিয়ে যত না চিন্তা করে, তার থেকে বেশি চিন্তা থাকে বিয়ের বিষয়টি নিয়ে।
বাল্যবিয়ের অন্যতম কারণ দারিদ্র্যতা। দেশে অধিকাংশ বাল্যবিয়ের কারণ এই দারিদ্র্যতা। দরিদ্র্য পরিবারের মেয়েরাই মূলত বাল্যবিয়ের শিকার হচ্ছে বেশি। দরিদ্র্য পরিবারের পিতামাতা সংসারের বোঝা কমানোর উদ্দেশ্যে মেয়ে সন্তানদের বাল্যবিয়ের মত একটি মরনফাঁদে ফেলে দেয়। ধনী পরিবারেও এটি বিরল নয়, ঘটে অহরহ।
সর্বোপরি, সামাজিক অস্থিরতা, নিরাপত্তার অভাব, বেকারত্ব, দূর্যোগপ্রবণ এলাকা, পারিবারিক ভাঙ্গন ও অবক্ষয়, শিক্ষার অভাব, সামাজিক ও ধর্মীয় কুসংস্কার, জনসচেতনতার অভাব, রাজনৈতিক অস্থিরতা, নৈতিকতা ও মূল্যবোধের অবক্ষয়, ধর্ষন, খুন, অপহরণ, এসিড সন্ত্রাস, গোড়ামী, ইভটিজিং, যৌতুক প্রথা, জালিয়াতি-দূর্নীতি এবং অজ্ঞতা প্রসূত নানা ধরনের বিশ্বাস ও ধারণা প্রসূত গোড়ামী প্রভৃতি।
গ্রামাঞ্চলে বাল্যবিয়ের ঘটনা বেশি ঘটে। শহরাঞ্চলেও কম ঘটছে তাও নয়। বিষয়টি এমনভাবে ঘটছে যা মানুষের অগোচরেই থেকে যাচ্ছে। বিভিন্নভাবে জালিয়াতির আশ্রয়ে এগুলো ঘটছে। কারো পক্ষে প্রতিবাদ করাও দূরুহ হয়ে উঠছে।
এখানে বয়স কোন কথা নয়, "গায়ে গতরে বড়" হওয়াকেই বিয়ের উপযুক্ত মনে করা হয়।

বাল্যবিয়ের কুফলঃ
চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায়, ১৮ বছরের আগে শরীরের যে সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো সন্তান ধারণের মত একটি জটিল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে সেগুলো বিকশিত হয় না।
গাইনিক্লোজি ডাক্তারদের মতে, একটি মেয়ের শারীরিক ও মানসিক পূর্ণতা আসে ২০ থেকে ২২ বছর বয়সে। শারীরিক ও মানসিক পূর্নতা আসার আগেই বিয়ে হলে তার ওপর প্রচন্ড খারাপ প্রভাব পড়ে।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষ্য মতে, একটি মেয়ের সন্তান ধারণের উপর্যুক্ত সময় ২৫-৩৫ বছর বয়স। সেখানে অল্প বয়সে বিয়ে মানেই অল্প বয়সে সন্তান ধারণ। বাল্যবিয়ের দরুন মা ও সন্তান উভয়ের মৃত্যুঝুকি বেড়ে যায়। স্বাভাবিক প্রসবের পরিবর্তে অপারেশন করিয়ে প্রসব করানো ও ফিস্টুলা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে বেশি।
কিশোরী গর্ভবতী মায়ের প্রসব জনিত ঝুকি, রক্তে বিষক্রিয়া, গর্ভপাত, খিচুনী, রক্তস্বল্পতা, রক্তক্ষরণ, বাধাগ্রস্ত প্রসব, সংক্রমন ও ক্ষত হয়। অনেক মহিলা এইচ,আই, ভিতেও আক্রান্ত হয়ে পড়ে। দেশে মা হতে গিয়ে প্রতি ২০ মিনিটে একজন মা মারা যাচ্ছে।
সারাবিশ্বে শিশুদের ১০-১৯ বছরকে কৈশোরকাল বলা হয়। এটি শিশুর প্রস্ফুটিত হওয়ার শ্রেষ্ঠ সময়। এখানেই নির্ধারিত হয় শিশু ফুল হয়ে ফুটবে, না কুড়ি অবস্থায় ঝরে যাবে।
১৮ বছরের আগে শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ হয় না। কৈশরকালে বিয়ে দিলে শিশুটি বিয়ের পরই হয়ে যায় সন্তান সম্ভবা। যে বয়সে শিশুর হাতে শিক্ষার সামগ্রী থাকার কথা, সে বয়সে তার কোলে থাকে সন্তান। যা দুজনের জন্যই চরম ক্ষতিকর। যে শিশুটির নিজের শারীরিক গঠনই পরিপূর্ণ হয়নি, তার গর্ভের শিশুর পূর্ণতা আসবে কি করে?
যার কারণে  শিশুর স্বল্প ওজন হয় ও অপুষ্টিতে ভূগে জটিল রোগে আক্রান্ত হয়। দেশে প্রতি ঘন্টায় মারা যাচ্ছে একজন নবজাতক। নবজাতক বেঁচে থাকলেও অনেক সময় তাকে নানা শারীরিক ও মানসিক জটিলতার মুখোমূখী হতে হয়। অপরিনত বাড়ন্ত পুষ্টিহীন শরীরে বেড়ে ওঠে আরেকটি অনাগত ভবিষ্যৎ, অপুষ্টিগত অভিশাপের বোঝা নিয়ে।
জন্ম দিবে কিছু দিন পর আরেকটি অপুষ্টিতে আক্রান্ত প্রজন্ম। বেড়ে চলে মা ও নবাগত শিশুর জীবনের ঝুকি। এতে দেশ হয় অপুষ্টি ও দূর্বল ভবিষ্যতের অধিকারী।
অপ্রাপ্ত বয়স্ক মা প্রতিবন্ধী শিশুর জন্ম দিতে পারে।
১৮ বছরের কম বয়সী মেয়েদের শরীর যৌন মিলনের জন্য প্রস্তুত হয় না। তারপরও বিয়ে হয়ে যাওয়া মেয়েদের স্বামীরা জোরপূর্বক যৌন সম্পর্ক করে। এতে বিভিন্ন ধরনের যৌনরোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
জরায়ু ক্যান্সার অল্প বয়সে মা হওয়ার সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। অল্প বয়সে বিয়ে জরায়ুমূখে ক্যানসারের অন্যতম কারণ। কেননা, এই বয়সে মেয়েদের জরায়ুমূখের কোষ পরিপক্ক হওয়ার আগেই স্বামীর সঙ্গে মিলিত হতে হয়। এতে কোষগুলোতে বিভিন্ন ইনফেকশন হয়ে ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
অল্প বয়সে বিয়ে হওয়ার কারণে অধিকাংশ মেয়েদের ইউটারেস যৌনাঙ্গের বাইরে বেরিয়ে আসে।
বাংলাদেশে শতকরা প্রায় ৬০ জন জরায়ু ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীর ইতিহাস ঘাটলে জানা যাবে বাল্যবিয়ে ও অধিক সন্তান এর একমাত্র কারণ।
নারীরা অধিক মাত্রায় নির্যাতনের শিকার হয় এবং মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে।
শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হয়। ফলে ক্রমাগত গরীব থাকে। শিক্ষার অভাবের কারণে নিরাপদ যৌন সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও দেখা দেয় নানা ধরনের অসুবিধা।
অল্প বয়সে বিয়ে হওয়ার কারণে মেরুদন্ডের হাড় ভেঙ্গে যাওয়া, ক্ষতের সৃষ্টি, ইনফেকশনসহ মেরুদন্ডে নানা জটিলতর রোগের সৃষ্টি হতে পারে।
সর্বোপরি, মহিলারা জীবনের মাঝপথে নানান রোগের জটিলতায় জীবনের প্রতি খেয় হারায়।
অল্প বয়সে সন্তান ধারনে অক্ষম হয়ে যেতে পারে।
অপ্রাপ্ত বয়সে বিয়ে হওয়ায় মেয়েরা প্রাপ্ত বয়স হওয়ার আগেই তাদের রুপ-লাবন্য শেষ হওয়ায় স্বামীদের চক্ষুসূল হয়। ফলে, তাদের উপর নেমে আসে অস্বাভাবিক নির্যাতন।

বাল্যবিয়ের কু-প্রভাবঃ
স্বামী, সংসার, শ্বশুরবাড়ি সম্পর্কে বুঝে উঠার আগেই সংসার এবং পরিবারের ভারে আক্রান্ত হয়। অন্যদিকে শ্বশুর বাড়ি থেকেও তার উপর চাপের সৃষ্টি হয়। শুরু হয় অশান্তি, পারিবারিক কলহ এবং সর্বোপরি পারিবারিক নির্যাতন।
এই পারিবারিক নির্যাতনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ শিকার হয় পরিবারের সবাই, বিশেষ করে শিশুরা ভোগে নানা মানসিক অশান্তিতে। এতে তারা লেখা-পড়ায় অমনোযোগী হয়ে যায়, পরিবারের প্রতি জন্মে নানা রকম অনিহা ও ঘৃনাবোধ, ফলে তারা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নানা রকম অপরাধ ও অনৈতিক কার্যকলাপের সাথে জড়িয়ে পড়ে।
বাল্যবিয়ের শিকার ছেলে ও মেয়ের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিনোদনের মত মৌলিক মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়। যা তাকে তার সারাজীবনের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত করে।
বাল্যবিয়ে একদিকে আইন এবং সংবিধানের লঙ্ঘন। অন্যদিকে বাল্যবিয়ের বর-কনেকে তার ব্যক্তি স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করা হয়। শিশুটি যৌন শোষন ও নিপিড়নের শিকার হয়।
বাল্যবিয়ে নারীর মনস্তাত্ত্বিক উন্নয়নের পথে বড় ধরনের অন্তরায়।
অপরিনত বয়সে মা হওয়ায় সন্তান লালন-পালনে ব্যর্থ ও মায়ের সঠিক পরিচর্যা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে শিশুরা।
বাংলাদেশে জনসংখ্যার বিস্ফোরনের অন্যতম কারণ এই বাল্যবিয়ে।
বর্তমানে বাল্যবিয়ে আমাদের সমাজে মেয়েদের জন্য একটি অভিশাপ। এই অভিশাপের কবলে পড়ে মেয়েরা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ও সামাজিকভাবে সকল বিষয়ে বৈষম্যের শিকার হয়।
মেয়েরা পারিবারিক হিংসা, যৌন অত্যাচার এবং সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্নতার শিকার হয়। নারীর প্রতি সহিংসতা বাড়ে।
শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণে, তার অধিকার সম্পর্কে অসচেতন থাকে। নিজস্ব মত প্রকাশ করতে পারে না। পর নির্ভরশীল হয়ে কাঁটাতে হয় সারাজীবন। তার অবস্থান চলে যায় সমাজের নিচু স্তরের চেয়েও খারাপ যায়গায়।
অল্প বয়সে বিয়ে হওয়ার কারণে মেয়েদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায় এবং পর্যায়ক্রমে অর্থনৈতিক, পারিবারিক ও সামাজিকভাবে শোষন-নির্যাতনের শিকার হয়।
বাল্যবিয়ে নারীর ক্ষমতায়নের অন্যতম প্রধান অন্তরায়। বাল্যবিয়ে কন্যা শিশুর পৃথিবীকে সংকুচিত করে দেয়।
বাল্যবিয়ের শিকার কিশোরীরা পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি, সন্তান গ্রহন, এমনকি বিয়ে সম্পর্কে ভালো কোন সুস্পষ্ট ধারনা রাখে না। তাই আমাদের দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ এই বাল্যবিয়ে।
অল্প বয়সে মা হওয়ার কারণে, মা ও শিশু নানা ধরনের রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। ফলে, পরিবারে দেখা দেয় অর্থনৈতিক দৈন্যতা।
বাল্যবিয়ের প্রভাবে বেড়েছে নারী নির্যাতন, বিবাহ-বিচ্ছেদ, বহুবিবাহ, পরকীয়া, আত্মহত্যা, পারিবারিক সহিংসতা, সামাজিক গোলোযোগ -বিশৃংখলা, পুষ্টিহীন ও প্রতিবন্ধী শিশুর জন্ম, গর্ভজনিত ও অপুষ্টিজনিত মৃত্যু প্রভৃতি। দৈনন্দিন এ সব সমস্যা সমাজকে একেবারে বিষিয়ে তুলছে।
বাল্যবিয়ের একক ফল হিসাবে, চক্রাকারে ক্রমাগত লিঙ্গের অসমতা, অসুস্থতা এবং গরীবি চলতে থাকে।
বাল্যবিয়ে মেয়েদের উপর কতখানি কু-প্রভাব ফেলে ও তার ফল কতটা মারাত্মক হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। নির্ধারিত বয়সের আগেই বিয়ের পিড়িতে বসতে হলে সেই মহিলার মানসিকতা ও ভাবাবেগকে আঘাত করে। স্কুলের গন্ডি পেরোনোর আগেই নিজের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এমন বন্ধনে সে আবদ্ধ হয়ে পড়ে, যা তার সাধারন বোধ-বুদ্ধির বাইরে। অনেক ক্ষেত্রেই শ্বশুর বাড়িতে তাদের গঞ্জনা-লাঞ্চনা ভোগ করতে হয়। ফলে, অচিরেই সেই সদ্য বিবাহিতা তার নিজস্ব সত্ত্বা হারিয়ে ফেলে। বাল্যবিয়ে শুধু মানবাধিকারের লঙ্ঘন করে না, একই সাথে সেই মেয়েরা কার্যত ভোগ্য-পণ্যের বস্তুতে পরিণত হয়।
সারা জীবন পরনির্ভর থাকার ফলে নিজের বুদ্ধি-বিবেচনা, চাওয়া-পাওয়া, ইচ্ছা-অনিচ্ছা কোন কিছুই তারা প্রকাশ করে না বা করতে পারে না। আর বিয়ে পরবর্তী জীবনে তার উপর যখন নির্যাতন বা অধিকার বঞ্চনার অবস্থা বিরাজ করে তখন হাজার ইচ্ছা থাকলেও সে কোন আইনের আশ্রয় নিতে পারে না।

বাল্যবিয়ের পরিসংখ্যানঃ
ব্রাকের এক গবেষনায় উঠে এসেছে, বাংলাদেশে বাল্যবিয়ের হার ৬৫ শতাংশ, যা দক্ষিন এশিয়ায় সর্বোচ্চ এবং পৃথিবীতে চতুর্থ। বাংলাদেশে প্রতি তিনটি বিয়ের দুটিতেই কনের বয়স থাকে ১৮ বছরের নিচে। বাল্যবিয়ের ৮০ শতাংশ ঘটে দরিদ্র্য পরিবারে।
আজ এই একুশ শতকে এসেও বাংলাদেশের ৬৬ শতাংশ মেয়ে এখনো শিক্ষা থেকে বঞ্চিত। যার প্রধান কারণ বাল্যবিয়ে।
জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) কতৃক প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১৮ বছরের আগে ৬৬ শতাংশ মেয়ে এবং একই বয়সের ৫ শতাংশ ছেলের বিয়ে হচ্ছে। মাঠ পর্যায়ে দেখা গেছে মাত্র একহাজার টাকার দেনমোহরে বিয়ে হচ্ছে এইসব সুবিধা বঞ্চিত মেয়েদের যাদের বয়স ১২ -১৬বছরের মধ্যে।
ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১০-১৯ বছর বয়সের দুই-তৃতীয়াংশ কিশোরী বাল্য বিয়ের শিকার হয়।
সেফ দা চিলড্রেন এর ২০১০ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের ৬৯ শতাংশ নারীর ১৮ বছর বয়স হওয়ার আগেই বিয়ে হয়ে যাচ্ছে।
জাতীয় কন্যা শিশু অ্যাডভোকেসি ফোরাম এর তথ্যমতে, বাংলাদেশে বাল্যবিয়ের হার ২০০৯ সালে ছিল ৬৪ শতাংশ, যা ২০১১ সালে দাড়ায় ৬৬ শতাংশ।
বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক এন্ড হেলথ সার্ভে এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে নারীর গড় বিয়ের বয়স ১৫ বছর ৩ মাস।
ইউনিসেফের প্রাপ্ত তথ্যমতে, দেশে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে বিয়ের হার ৬৬ শতাংশ এবং ১৫ বছরের আগে বিয়ের হার ৩২ শতাংশ।
বাংলাদেশে গর্ভবতী নারীদের মধ্যে ৫৭ শতাংশের বয়স উনিশ এর নিচে। বাল্যবিয়ের কারণে ৪১ শতাংশ মেয়ে স্কুল ত্যাগ করে।
এক জরিপে দেখা গেছে, শতকরা ৫০ শতাংশই অপ্রাপ্ত বয়স্ক নারীর স্বামী বা অভিভাবকরা বিয়ের প্রথম বছরের সন্তান দেখতে চায়। ফলে, প্রাপ্ত বয়স হওয়ার আগেই তাকে মা হতে হয়।
১৮ বছরের কম বয়স মেয়ের মাতৃজনিত মৃত্যুর হার প্রতি হাজারে ৩.২ জন। বাল্যবিয়ের শিকার শতকরা ৮০ ভাগ নারীরা হচ্ছে স্বামী কতৃক নির্যাতিত। এছাড়া এসব নারীর শতকরা ৬০ ভাগ শিশুই জন্মগত নানাবিধ রোগ ও প্রতিবন্ধীর শিকার হচ্ছে।
এ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের শতকরা ৩০ শতাংশ মা এবং ৪১ শতাংশ শিশু অপুষ্টিতে ভূগছে।
ইনিশিয়েটিভ ফর ম্যারেজ অ্যাডলোসেন্ট গার্লস এমপাওয়ারমেন্ট (ইমেজ) এর এক জরিপ থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, ৯৮.৭ শতাংশ বিবাহিত কিশোরী মনে করে যে ১৮ বছরের নিচে মেয়েদের বিয়ে হওয়া উচিত নয়।

বাল্যবিয়ে নিরোধ আইনঃ
২০১৩ এর খসড়া আইনে বাল্যবিয়ের যে শাস্তির বিধান রয়েছে তা নিম্নরুপ-
শিশু বিবাহকারীর শাস্তি, একুশ বৎসরের অধিক বয়স্ক কোন পুরুষ বা আঠারো বৎসরের অধিক বয়স্ক কোন নারী কোন শিশু বা নাবালকের সহিত বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের চুক্তি করিলে সেই ব্যক্তির দুই বৎসর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদন্ড বা ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদন্ড বা উভয়দন্ডে দন্ডনীয় হইবে।
বাল্যবিয়ে অনুষ্ঠান বা পরিচালনাকারীর শাস্তি, কোন ব্যক্তি বাল্যবিয়ে অনুষ্ঠান বা পরিচালনা করিলে সেই ব্যক্তি দুই বৎসর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদন্ড বা ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদন্ড বা উভয় দন্ডে দন্ডনীয় হইবে। যদি না তিনি প্রমান করিতে পারেন যে, বিবাহটি বাল্যবিবাহ ছিল না বলিয়া বিশ্বাস করিবার মত যথেষ্ট যুক্তি ছিল।
বাল্যবিবাহ অনুষ্ঠানের সহিত সম্পর্কিত পিতামাতা বা অভিভাবকের  শাস্তি-(ক) যেই ক্ষেত্রে কোন নাবালক কোন বাল্যবিবাহের চুক্তি করে এবং পিতামাতা অথবা আইনানুগ বা বেআইনী যেকোন এখতিয়ারেই হউক না কেন, কোন ব্যক্তি উক্ত নাবালকের উপর কতৃত্ব সম্পন্ন হইয়া বিবাহ কার্য সম্পন্ন করিবার ক্ষেত্রে কোন কাজ করিলে বা সম্পন্ন করিবার অনুমতি প্রদান করিলে বা স্বীয় অবহেলার জন্য বিবাহটি বন্ধ করিতে ব্যর্থ হইলে, সেই ব্যক্তি দুই বৎসর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদন্ড বা ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদন্ড বা উভয় দন্ডে দন্ডনীয় হইবে।
(খ) যেই ক্ষেত্রে কোন নাবালক বাল্যবিবাহের চুক্তিবদ্ধ হয় সেই ক্ষেত্রে বিপরীত বিষয় প্রমানিত না হওয়া পর্যন্ত, উক্ত নাবালকের উপর কতৃত্ব সম্পন্ন ব্যক্তি স্বীয় অবহেলায় বিবাহটি বন্ধ করিতে ব্যর্থ হইয়াছেন বলিয়া বিবেচিত হইবে।
নিকাহ রেজিস্ট্রার-এর নিবন্ধন বাতিল-স্বেচ্ছায় বাল্যবিবাহ অনুষ্ঠানে বা আয়োজনে সহায়তাকারী নিকাহ রেজিস্ট্রারেরর নিবন্ধন বাতিল করা হইবে, যদি না তিনি প্রমান করিতে পারেন যে, বিবাহটি বাল্যবিবাহ ছিল না বলিয়া বিশ্বাস করিবার মত যথেষ্ট যুক্তি ছিল।

বাল্যবিয়ের প্রকারভেদঃ
আইন অনুসারে তিন ধরনের বিবাহ আইনত দন্ডনীয়-
ক. প্রাপ্ত বয়স্কের সাথে অপ্রাপ্ত বয়স্কের বিবাহ।
খ. অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলে ও মেয়ের বিয়ে।
গ. অপ্রাপ্ত বয়স্ক পাত্র-পাত্রীর অভিভাবক কতৃক বিয়ে নির্ধারন বা সম্মতি দান।

একটি বাস্তবতাঃ
১৪-১৫ বছর বয়সী মেয়েরা তুলনামূলক একটু বেশি আবেগ-প্রবন থাকে। এই আবেগকে অভিভাবকরা কাজে লাগাতে ভূল করে না। মেয়ে একটু সুন্দর হলে আর কথা থাকে না। তাই বিয়ের বাজারটাও বেশ গরম ও চড়া থাকে।
উচ্চ শিক্ষিত, এমনকি সরকারী চাকরীজীবীদেরও জালিয়াতির মাধ্যমে এই নিকৃষ্ট কাজে জড়িত হতে দেখা যায়। নিজের বয়স ৩০-৩৫ হলেও বিয়ের পাত্রী বাছাইয়ের তালিকায় থাকে ১৫-১৬ বছর বয়সী মেয়ে। (বড়ই, দুঃখজনক ব্যাপার)

প্রতিকার বা প্রতিরোধের উপায়ঃ
বাল্যবিয়ে নিরোধ আইনটি বাস্তবায়নে ব্যাপক প্রচার-প্রচারনা করা প্রয়োজন।
রেডিও, টেলিভিশন ও সংবাদপত্র এমনকি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাল্যবিয়ের কুফল সম্পর্কে জনগনকে সচেতন করা যেতে পারে/ করতে হবে।
গ্রাম পর্যায়ে উঠান বৈঠক ও মা সমাবেশ এক্ষেত্রে ফলপ্রসূ হবে। বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ করার জন্য প্রয়োজনে প্রশাসনের পক্ষে এটা করা যেতে পারে।
বয়সের সনদ ব্যতিত কোন অবস্থায়ই নিকাহ রেজিস্ট্রার যেন বিয়ে নিবন্ধন না করে, সেইরুপ আইন প্রনয়ন দরকার। তাছাড়া জালিয়াতির বিষয়টিও দেখতে হবে।
প্রতিটি ইউনিয়নে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ কমিটি গঠন করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানগন সবচাইতে বেশি ভূমিকা রাখতে পারেন।
পাঠ্য বইতে বাধ্যতামূলকভাবে বিষয়টি অন্তর্ভূক্ত করা হলে ভাল সুফল পাওয়া যাবে।
জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে ব্যক্তি পর্যায় থেকে শুরু করে বেসরকারী সংস্থাগুলোও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে।
সর্বোপরি, বাল্যবিয়ে একটি সামাজিক ব্যধি। এই ব্যধি নির্মূলে সমাজের সকল শ্রেনীর মানুষের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা আর সহযোগিতা প্রয়োজন। বাল্যবিয়ে রোধে নারী শিক্ষার কোন বিকল্প নেই। বাল্যবিয়ের ক্ষতিকর দিকগুলো সবার সামনে উপস্থাপন, নারী শিক্ষার প্রসার ও উন্নয়ন, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আইনকে আরো বেশি কার্যকরী করা হলে বাল্যবিয়ে রোধ করা সম্ভব।

উপসংহারঃ
পরিশেষে আমরা যদি সবাই সচেতন হই তাহলে কন্যা শিশুদের অধিকার প্রতিষ্ঠা হবে। দেশে মা ও শিশুর অকাল মৃত্যু রোধ করা সম্ভব হবে।
তাই বাল্যবিয়ে বন্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে এখন থেকেই। আমি চাই বাল্যবিয়ের কারণে মেয়েদের স্বাস্থ্য ঝুকি, শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হওয়া, যৌতুকের বলি হওয়া এবং পরাধিনতার শৃংখলে আর বদ্ধ না হোক। জীবনকে উপভোগ করুক নির্মল আনন্দে।
বাল্যবিয়ে একদিকে ভয়াবহ সামাজিক অভিশাপ এবং অপরদিকে মারাত্মক সামাজিক সংকটের সৃষ্টি করছে।
কাজেই আসুন, আপনি, আপনার পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে সুখ-শান্তি, শৃংখলা বজায় রাখার স্বার্থে এবং সুখী সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে বাল্যবিয়ে রোধ করি।
নিজের পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, যেই হোক না কেন। আসুন, বাল্যবিয়ের ক্ষতিকর বিষয়গুলো তাদেরকে বোঝায়। বাল্যবিয়ে রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখি।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০২১ সালের মধ্যে ১৫ বছরের নিচে বিয়ের সংখ্যা শূন্যে এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে ১৮ বছরের নিচে বিয়ের সংখ্যা শূন্যে নামিয়ে আনার ঘোষনা দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর এই স্বপ্ন দ্রুত বাস্তবায়িত হবে বলে আমরা আশা করি। একদিন বাংলাদেশ হবে বাল্যবিয়ে মুক্ত।

বয়সের ব্যবধানে বিয়ের কুফলঃ
আমাদের দেশে বিয়ের ক্ষেত্রে স্বামী বা স্ত্রীর বয়সের পার্থক্য থাকে অনেক। এই বয়সের পার্থক্যের কারণে যে শুধু মেয়েটির জীবনে অন্তহীন সমস্যা নিয়ে আসে তা নয়, বরং দাম্পত্য জীবনে নানা রকমের সমস্যা দেখা দেয়। এরকম অনেক সমস্যার কথা আমি বলতে পারব। শুধু গ্রামাঞ্চলেই বয়সের অনেক ব্যবধানে বিয়ে হচ্ছে তা নয়, শহরেও এটি ঘটে। একটি উচ্চ শিক্ষিত ছেলে চাকরী পেয়ে নিজে গুছিয়ে বিয়ে করতে গেলে তার বয়স হয়ে যায় ৩০-৩৫ বছর। আমাদের সমাজে অনেক পরিবার মনে করে, একটি শিক্ষা শেষ করা বা চাকরীজীবী ২৫-২৬ বছর বয়সের মেয়ের চেয়ে উচ্চ মাধ্যমিক বা ডিগ্রি পড়ুয়া মেয়ে হলে তাকে নিয়ন্ত্রন করা সহজ হবে।
আমার আপত্তিটা এখানেই যে,  বিয়ের মত একটি সুন্দর সম্পর্ক কেন প্রভাব খাটানোর মনোভাব নিয়ে শুরু হবে। তারা ভাবে না বয়সের পার্থক্যের কারণে, ঐ স্বামী বা স্ত্রীর মধ্যে অভিজ্ঞতা, মানসিক চিন্তা-ভাবনা, জেনারেশন গ্যাপ আর আবেগের যে পার্থক্য থাকে তা সংসারে অশান্তি, সংসার ভেঙ্গে যাওয়া, সামাজিক বিশৃংখলা, পারিবারিক গোলোযোগ একং পরকীয়াসহ নানান সমস্যা হতে পারে। মেয়েটি পারে না দাম্পত্য জীবন ও মাতৃত্বকে উপভোগ করতে। যে সংসারে সুখ থাকার কথা কানায় কানায়, সে সংসার হয় অশান্তির কারখানা। ধর্মেও অনেক বয়সের ব্যবধানে বিয়ে নিষেধ করা হয়েছে।
জাতিসংঘের শিশু তহবিলের মাধ্যমে জানা যায় যে, ১২/১৩ অথবা ১৫/১৬ বছরের একটি মেয়েকে ২৭ বা আরো বেশি বয়সের একজন পুরুষ বিয়ে করছে। স্বামীর কাছে তার বউ একজন শিশু মাত্র। এইভাবে শ্বশুর বাড়ির লোকজন মনে করেন তাকে তো শাসন করাই যায়। এতে বালিকা বধুর প্রতি নির্যাতনের মাত্রা বাড়ে। কিন্তু, ঐ বালিকা বধুর কথা বলার অধিকার থাকে না। সে ভাবে এটাই হয়তো নিয়ম। আর এ ধরনের নির্যাতনের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে উঠছে না।
নতুন এক গবেষনা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, বয়সের ব্যবধানে বিয়ের কারণে এবং বেশি বয়সের বিয়ের কারণে বয়সের অনুপাতে সন্তান শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধী হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।
তাছাড়া বেশি বয়সের ব্যবধানে বিয়ের কারণে স্বামী ও স্ত্রী উভয়েরই নানান শারীরিক ও মানসিক জটিলতা দেখা দেয়।
-----------------------------------------------
এটি আমার প্রথম গবেষনামূলক নিবন্ধ। এটা রচনা করতে আমি দেশি-বিদেশি যে সকল জার্নাল ও দেশি-বিদেশি সংস্থার ওয়েব সাইটের সাহায্য নিয়েছি তাদের প্রতি আমি চির কৃতজ্ঞ এবং এ কাজে যেসকল ভাই-বোন, বন্ধু, মরুব্বি আমাকে সাহায্য করেছে তাদের জানাই সাধুবাদ। বিশেষ করে বাল্যবিয়ের শিকার, যারা আমাকে সরেজমিনে তথ্য দিয়ে সাহায্য করেছে তাদের কাছে চিরঋনী হয়ে থাকলাম।