সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

শিক্ষার্থী নির্যাতন

(কথাগুলো বলছি বিকারগ্রস্ত লোকের বিরুদ্ধে। সম্মানিত শিক্ষকদের সম্মানের জায়গা অনেক উচুতে এবং সংরক্ষিত থাকবে অনন্তকাল)। 
বেড়ে উঠার জন্য প্লাটফর্ম দরকার। ধরুন, আপনি ব্যাপক একজন মেধাবী মানুষ কিন্তু আপনাকে বেড়ে উঠার জন্য কোন স্পেচ, সুযোগ-সুবিধা দেয়া হলো না। আপনার অকালে ঝরে যাওয়ার সম্ভাবনা একশোতে একশো। 
যাইহোক, মূল বিষয়ে যাওয়া যাক। শুনেছি বাংলাদেশে নতুন আইন হয়েছে যে, কোন শিক্ষক কতৃক তার ছাত্র-ছাত্রী শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতিত হলে তার জন্য শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। শিক্ষা আইনের খসড়ায় শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক শাস্তির বিষয়ে বলা হয়েছে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অবস্থানকালীন মানসিক বা শারীরিক শাস্তি দেয়া যাবে না। এটি লঙ্ঘন করলে শিক্ষক অনধিক ১০ হাজার টাকা অর্থদন্ড বা তিন মাসের কারাদন্ডে দন্ডিত হবেন। যাহোক, বর্তমান সরকার এটুকুতো করেছে! নেই মামার চেয়ে কানা মামা অনেক অনেক ভালো। ধন্যবাদ সরকারকে। 
এখানে যে শাস্তির কথা বলা হয়েছে আমার কাছে মনে হয়েছে এটা নিতান্তই.......। কারণ, শিক্ষকের কাজ পড়ানো, মারধর করা নয়। যেসকল শিক্ষক নামধারী লোক ছাত্রছাত্রী মারে, তাদের আর যাই হোক শিক্ষক না বলে মানসিক রোগগ্রস্ত বলা যাইই! শিক্ষক জাতি গড়ার কারিগর, রাখাল নয়। যেসকল শিক্ষক পড়ানো বাদ দিয়ে মারপিট নিয়ে মাথা ঘামায় তাদের মনে রাখা উচিৎ এখানে তাদের রাখাল হিসেবে নিয়োগ করা হয়নি। তারা শিক্ষকের পদ দখল করে আছে। 
শিক্ষক কতৃক ছাত্রী ধর্ষিত, ছাত্র বলাৎকার, অঙ্গহানী, ক্ষতসৃষ্টি এমনকি মৃত্যু, কত কিছু পত্র-পত্রিকায় পড়ি আমরা। কিছুদিন আগে শিক্ষক কতৃক ছাত্র ঝাটাপেটার কথা শুনলাম। পরে নাকি ঐ ছাত্রকেই বহিষ্কার করা হয়েছিল। আবার, প্রথমে শিক্ষক পরে বহিরাগতকতৃক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ঢুকে ছাত্রপেটানোর কথাও পত্রিকার মাধ্যমে জানতে পারি। এটাতে শিক্ষকের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ছিল বলে জানা যায়। প্রতিকারহীনভাবে মিডিয়ার আড়ালেই রয়ে যায় বেশিরভাগ ঘটনা। কোন দেশে আছিরে ভাই! যেদেশের শিক্ষকের ছাত্রছাত্রী নির্যাতনের অবস্থা এই, সে দেশ ডিজিটাল হবে কিভাবে? জনশ্রুতি অনুযায়ী, শিক্ষক জাতি গড়ার কারিগর। কারিগর যদি ভাংড়ি হয়, তাহলে তার তৈরি করা জিনিস দিয়ে বড়জোর  কি হতে পারে ভেবেই দেখুন। বলাই বাহুল্য! 
আমার মতে, এটা শিশু নির্যাতন। যেহেতু ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত মানব সন্তান শিশুই থাকে সেহেতু এটাকে শিশু নির্যাতন বললে ভুল হবে না। 
সম্মানকে পুজি করে কত খারাপ কাজ করতে দেখা যায়। কান্ডজ্ঞানের চশমা পরা থাকলে আপনি অবশ্যই দেখতে পাবেন। 
যারা মানুষের এই দুর্বলতার সুযোগ গ্রহন করে তাদের আর যাই হোক ভালো মানুষের কাতারে ফেলানো যায় না। শিক্ষকতো নয়ই, কেননা শিক্ষকতা মহান কাজ। (খারাপকে ভালো বলা যায় না। সেটা মিথ্যা কথা হয়। আর মিথ্যা বলা মুনাফেকের কাজ।) 
উন্নত বিশ্বে শিক্ষকগন ছাত্রদের সঞ্চালকের ভূমিকা পালন করেন। আর আমাদের দেশের শিক্ষক বেত সঞ্চালকের ভূমিকা পালন করেন।  আবার এই মারধরের পক্ষে রসালো যুক্তি খাড়া করে। কি হাস্যকর, তাইনা! 
ছাত্ররা শিখতে আসে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। মার খেতে নয়। শেখার সময় ভুল হওয়াটা স্বাভাবিক। ভুল জীবনের একটি অংশ। আর একজন শিক্ষকের কাজ ছাত্রদের ভুলগুলো শুধরে নেয়ার পথ বাতলে দেয়া, মারা নয়। শিক্ষার পক্ষে উৎসাহিত করা, নিরুৎসাহিত করা নয়। 
শিক্ষকদের এমনও বলতে শোনা যায়, 'তোর দিয়ে হবে না'। এটা কোনো কথা! শিক্ষকগন ছাত্রছাত্রীদের অনুপ্রেরণার খুঁটি স্বরুপ। তাদের মূখ দিয়ে যদি এমন কথা বাহির হয়, তাহলে ছাত্রছাত্রীরা আর কোথায় যাবে? 
আমার জীবনে বহু লোককে দেখেছি শিক্ষকের বেতের ভয়ে, স্কুল পালাতে, পড়ালেখা বাদ দিতে। স্কুল পালিয়ে সবাই রবীন্দ্রনাথ, এডিসন, বিল গেটস, জাকারবর্গ হতে পারে না। শেষমেষ বাদই দেয়। একজনের ভুলে, আরেকজনের জীবন চলে যায় ধ্বংসের দিকে। কি আজব সিস্টেম! 
ছাত্রছাত্রীরা নানাবিধ কারণে প্রতিবাদ করতে পারে না। কিন্তু, প্রতিবাদের ক্ষেত্র থাকলে তারা অবশ্যই এহেন ন্যাক্কারজনক কাজের প্রতিবাদ করত। 
অনেককে বলতে শুনেছি, শিক্ষকের বেতের বাড়ি, ফুল গাছে মালির পানি দেয়ার মত। এটা বিকৃত মস্তিস্কের বিকৃত চিন্তা-ভাবনা। 
দেখা গেছে, শৈশবে ও কৈশোরে যেসকল ছেলেমেয়ে শিক্ষকের হাতে লাঞ্চিত-বঞ্চিত-নির্যাতনের শিকার হয় তাদের স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত। প্রহার শিক্ষার সহায়ক বা বিকল্প হতে পারে না। এজন্য প্রত্যেক পিতামাতার সর্বদা সজাগ-সতর্ক থাকতে হবে। যাতে এ ধরনের কার্যকলাপ তার সন্তানের সাথে না ঘটে। 
আসুন এ ব্যাপারে বিজ্ঞ মনীষীদের কিছু চিন্তা-ভাবনা ও মতামত আমরা দেখার চেষ্টা করি-- 
০১. প্রথমে স্বরণ করি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথকে। তিনি তার 'তোতাকাহিনীতে' বিষয়টা অত্যন্ত সুচারুরুপে রুপকের আশ্রয়ে তুলে ধরেছেন। সময় থাকলে দেখে নিবেন। 
০২. বার্ট্রান্ড রাসেল তার 'One Education' গ্রন্থে গল্পটি অবতারনা করেন-যাতে শিক্ষা বা শাসনের প্রাচীন পদ্ধতির মিল খুঁজে পাওয়া যায় এবং ফুটে ওঠে এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহের চিত্র। 
শেহর বলেছেন,  তার কাকা একটি বিড়াল ছানাকে ইঁদুর ধরা শেখাতে চেষ্টা করছিলেন। বিড়াল ছানাটি যেখানে রাখা হয় সেখানে একটি ইদুর নিয়ে আসা হয়। কিন্তু, বিড়ালের শিকার করার প্রবৃত্তি তখনও জাগ্রত হয়নি; কাজেই সে ইঁদুরের প্রতি মনোযোগ দেয় না। শেহরের কাকা এতে শিকারের প্রবৃত্তির কৌশল হিসাবে বিড়াল বাচ্চাটিকে প্রহার করেন। 
পরদিন একই প্রক্রিয়া অনুষ্ঠিত হলো। ক্রমাগত কয়েকদিন এরুপ চলতে লাগল। শেষে অধ্যাপক মনে করেন বিড়ালটি অত্যন্ত বোকা এবং শিক্ষাদানের সম্পূর্ন অযোগ্য। পরবর্তীতে বিড়ালটি অন্যান্য বিষয়ে স্বাভাবিক আচরণ করলেও ইঁদুর দেখলে ভয়ে কাঁপতে থাকত এবং ছুটে পালাত। শেহর বলেন - বিড়াল বাচ্চাটির মতোই কাকার কাছ থেকে আমার ল্যাটিন শেখার ভাগ্য হয়েছিল। 
বোস্টন চিলড্রেন'স মেডিকেল সেন্টারের সদস্য জর্জ ই গার্ডনার তার 'The emerging personality' গ্রন্থে বলেন- A threat can only remain discipline from outside. অর্থাৎ ভয়ভীতি কেবল বাহ্যিক শৃংখলা রক্ষার কাজটি করতে পারে। গার্ডনার বলতে চেয়েছেন, ভেতরের শৃংখলাই মূখ্য যা রূঢ় শাসন দিয়ে প্রতিষ্ঠা করা দূঃসাধ্য। প্রফেসরের কাছে প্রহারের উদ্দেশ্য পরিস্কার হলেও বিড়াল বাচ্চাটির  কাছে তা পরিস্কার নয়। বিড়ালটি যা পেল তা হলো প্রহার, ইদুর ধরার শিক্ষা নয়। ভীতিকর শাসনে কিভাবে ভয় পেতে হয় সে শিক্ষা বিড়াল ছানাটি ঠিকই নিয়েছে। 
প্রেরণা এমন এক শক্তি যা কর্মের পরিচালক। প্রেরণার মাঝেই আমরা স্বাচ্ছন্দ্যময় ভবিষ্যতের ছবি জীবন্ত প্রত্যক্ষ করি। প্রেরণাদায়ক পরিবেশ আমাদের জেগে উঠতে সাহায্য করে আর প্রেরণাহীন রুক্ষ পারিপার্শ্বকতা আমাদের ক্রমশ পেছনে টানে। সে সমাজ আমাদের জন্য আতঙ্কের, যেখানে 'তোমার ভালোর জন্য' এ আশা জাগানিয়া স্লোগানে প্রস্তুত করার নামে দুর্বল করার গোপন মহড়া চলছে। 
০৩. আমাদের মহানবী হযরত মুহম্মদ (সঃ) থেকে এ ব্যাপারে আমরা সবচেয়ে বড় উদাহরন টানতে পারি। হাসান-হোসেনের (রাঃ) সাথে তার যে সম্পর্ক সেটাতো এমন কোন ঘটনা নির্দেশ করে না। 
আর তিনি সব সময় ছোটদের সাথে উত্তম ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন এবং খারাপ ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকতে কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন। 
উদাহরণ টানতে যেসকল পুস্তকের সাহায্য নিয়েছিঃ ০১. রবীন্দ্র রচনাবলী ০২. ছাত্রজীবনে সাফল্য ও জীবনদৃষ্টি ০৩. আল হাদিস।